অবশেষে ইরানে হামলার কারণ খোলাসা করল যুক্তরাষ্ট্র

অবশেষে ইরানে হামলার কারণ খোলাসা করল যুক্তরাষ্ট্র

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি মন্তব্য নতুন করে ভূ-রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে। হোয়াইট হাউসের এক সিনিয়র কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হলো ইরানের বিশাল তেল মজুদের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়া। এই মন্তব্যের পটভূমিতে দখলদার ইসরাইলের হামলা ও ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া রয়েছে, যা পুরো অঞ্চল জুড়ে সংঘাতকে ত্বরান্বিত করছে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইসরাইল ইরানের সামরিক স্থাপনাসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে তেহরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ইসরাইলি লক্ষ্যবস্তু এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা করতে শুরু করেছে। সংঘাত লেবানন, সিরিয়া, ইরাক ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। গোলান মালভূমিতে হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলা ও বাগদাদে মার্কিন স্থাপনার ওপর রকেট হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

হোয়াইট হাউসের ন্যাশনাল এনার্জি ডমিনেন্স কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক জ্যারড অ্যাজেন এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো ইরানের বিশাল তেলের মজুদ সন্ত্রাসীদের হাত থেকে কেড়ে নেওয়া। তার মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। সমালোচকদের মতে, এটি মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা শক্তিগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগকে আরও জোরালো করছে যে, এই অঞ্চলে হস্তক্ষেপের পেছনে মূলত প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন জড়িত।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রমাণিত তেল মজুদের যোগানদাতা, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো বহু বছর ধরে ইরানের তেল রপ্তানি সীমিত করার চেষ্টা করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক মন্তব্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকরা এখন আরও বিস্তৃত কৌশল নিয়ে ভাবছেন, যেখানে জ্বালানি সম্পদের ওপর প্রভাব বিস্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।

এই সংঘাতের আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালীতে, যেখানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। সামরিক উত্তেজনা ও হামলার কারণে অনেক জাহাজ কোম্পানি এই পথে চলাচল সীমিত অথবা স্থগিত করেছে। কিছু ট্যাঙ্কার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর বীমা কোম্পানিগুলো ঝুঁকি কমাতে কভারেজ প্রত্যাহার করতে শুরু করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে গেছে।

সংঘাতে নিহতের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। ইরানের দাবি অনুযায়ী, হামলা শুরুর পর থেকে এক হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই হামলার তদন্ত ও বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত এখন আর কেবল ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি ও আন্তর্জাতিক জোট এতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার প্রকাশ্য সমর্থন, চীনের সম্ভাব্য কূটনৈতিক তৎপরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান এই সংঘাত ভবিষ্যতে বৈশ্বিক রাজনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই মানবিক বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাড়বে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পুরো বিশ্বকে বহন করতে হতে পারে।

আরও পড়ুন