ইরানের গ্রানাইট ‘মিসাইল সিটি’: ট্রাম্পের হুঙ্কারের পরও টিকে থাকার

ইরানের গ্রানাইট ‘মিসাইল সিটি’: ট্রাম্পের হুঙ্কারের পরও টিকে থাকার

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরানের ভূগর্ভস্থ ‘ক্ষেপণাস্ত্র শহর’ নেটওয়ার্ক টিকে রয়েছে। কয়েক সপ্তাহের মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলা সত্ত্বেও ইরান মধ্যপ্রাচ্যে তার রকেট ও ড্রোন ব্যবহার করতে সক্ষম হচ্ছে।

ইরানের মধ্যাঞ্চলের ইয়াজদ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি গ্রানাইট পর্বতের প্রায় ৫০০ মিটার গভীরে অবস্থিত। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই স্থাপনা যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী বাঙ্কার-বাস্টিং বোমা জিবিইউ-৫৭ সহ্য করতে পারে। এটি ধ্বংস করতে একই পয়েন্টে একাধিক সুনির্দিষ্ট হামলা ও বিস্তারিত গোয়েন্দা তথ্য প্রয়োজন।

ইয়াজদ ঘাঁটিতে একটি স্বয়ংক্রিয় রেল ব্যবস্থা রয়েছে, যা টানেলের মাধ্যমে সংযোজন এলাকা ও স্টোরেজ ডিপোকে সংযুক্ত করে। ইরানি ভিডিওতে দেখা যায়, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপকগুলো দ্রুত স্থানান্তরিত হয়ে বাইরে থেকে ফায়ার করা হয় এবং আবার ভূগর্ভে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের মতে, ট্রাম্পের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর ইয়াজদ ঘাঁটিতে অন্তত ছয়বার হামলা চালানো হয়েছে। ২৮ মার্চের একটি ভিডিওতে সেখান থেকে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হতে দেখা গেছে, যা ভূগর্ভস্থ ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা নির্দেশ করে।

মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, ইরানের এখনও অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক এবং হাজার হাজার ড্রোন রয়েছে। সিএনএন তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ইরানের উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষমতা বজায় আছে। ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর একটি বড় অংশও অক্ষত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইসরায়েলের অনুমান অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরুতে ইরানের প্রায় ৪৭০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক ছিল। গত মাসে তারা দাবি করেছিল এর ৬০ শতাংশ ধ্বংস হয়েছে, কিন্তু বর্তমান গোয়েন্দা তথ্য ইরানের সক্ষমতা বেশি শক্তিশালী বলে নির্দেশ করে।

সিএনএনের তদন্তে দেখা গেছে, টানেলের দৃশ্যমান প্রবেশপথের ৭৭ শতাংশে হামলা চালানো হলেও সাইটগুলোতে কার্যক্রম দ্রুত পুনরায় শুরু হয়েছে। ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সির ফুটেজে একটি স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও শাহেদ ড্রোনের সারি এবং টানেলে ট্রাক দেখা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রাউন্ড অপারেশনের মাধ্যমে এই গভীর ও জটিল টানেল সিস্টেম মোকাবিলা করা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও কঠিন। প্রতিটি সাইট আলাদাভাবে মোকাবিলা করতে হবে, যা সফল হওয়া কঠিন।

কয়েক সপ্তাহের বোমাবর্ষণ সত্ত্বেও ইরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। গত শুক্রবারের হামলায় কুয়েতের একটি তেল শোধনাগার ও আবুধাবির একটি গ্যাস কমপ্লেক্স আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। ইরান দাবি করেছে তারা একটি মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ‘পাথরের যুগে’ ফিরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন, আবার দাবি করছেন মার্কিন বাহিনী জয়ী হয়েছে। তার মতে পরবর্তী লক্ষ্য সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই অনিশ্চয়তা ইরানকে ভূগর্ভস্থ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে উৎসাহিত করতে পারে।

ইরান কয়েক দশক ধরে এই ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো তৈরি করেছে, যা সাধারণ বাঙ্কারের চেয়ে উন্নত। স্বয়ংক্রিয় রেল ব্যবস্থা ও দ্রুত স্থানান্তর প্রক্রিয়ার কারণে উৎক্ষেপক শনাক্ত করা কঠিন। তেহরান এই স্থিতিস্থাপকতার ওপর ভরসা করে যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে ক্ষতিপূরণ ও হরমুজ প্রণালীতে একচ্ছত্র অধিকারের দাবি জানাচ্ছে।

মার্কিন গোয়েন্দারা দাবি করছেন ইরানের যুদ্ধশক্তি কমেছে, কিন্তু তেহরান বহু বছর ধরে এমন হামলার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। ইরানের বিশ্বজুড়ে তেলের জোগান নিয়ন্ত্রণ ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্রদের দুর্বলতার সুবিধা রয়েছে।

ইরানের হামলার গতি কমলেও তা পুরোপুরি থেমে যায়নি, বরং নিয়মিত ছন্দে চলছে। এর মানে তাদের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সচল রয়েছে। গ্রানাইট পাথরের নিচের ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার সুরক্ষিত রাখছে, ফলে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করেই ইরান টিকে আছে।

আরও পড়ুন