যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও নতুন আলোচনা ঘিরে বিদেশে আটকে থাকা তেহরানের ‘ফ্রোজেন অ্যাসেটস’ বা জব্দ সম্পদের প্রসঙ্গ আবারো সামনে এসেছে। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের অর্থনীতি চাপে থাকায় এই সম্পদ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনা কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকটের কারণে প্রথমবারের মতো ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। পরবর্তীতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের কারণে নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হয়। এর ফলে ইরানের তেল রপ্তানি থেকে অর্জিত আয়ের একটি বড় অংশ বিদেশি ব্যাংকগুলোতে আটকে যায়।
১০ এপ্রিল পাকিস্তানে যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত আলোচনা শুরুর আগে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত না হলে কোনো আলোচনা শুরু করা উচিত নয়। ইসলামাবাদে বৈঠকের সময় কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র কিছু অর্থ ছাড় দিতে রাজি হয়েছে। তবে মার্কিন প্রশাসন তা অস্বীকার করে জানায়, ইরানের সম্পদ এখনও জব্দ অবস্থায় রয়েছে।
ইরানের জব্দকৃত সম্পদের পরিমাণ নিয়ে নির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও সরকারি সূত্র ও বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ ১০,০০০ কোটি ডলারের বেশি। মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের গবেষক ফ্রেডেরিক শ্নাইডার জানান, এই অর্থ ইরানের বার্ষিক তেল ও গ্যাস আয়ের প্রায় তিন গুণের সমান।
তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা দেশের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্থনৈতিক সম্পদ। ইরান বর্তমানে আলোচনায় অন্তত ৬০০ কোটি ডলার মুক্ত করার দাবি তুলেছে। তবে অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অর্থ ছাড় পেলেও নানা শর্তের কারণে এর পূর্ণ সুবিধা ইরান পায়নি।
ফ্রোজেন অ্যাসেটস বলতে বোঝায় এমন সম্পদ যা নিষেধাজ্ঞা, আদালতের আদেশ বা আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের কারণে সাময়িকভাবে ব্যবহার বা স্থানান্তর করা যায় না। সমালোচকদের মতে, পশ্চিমা দেশগুলো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবেও এই ব্যবস্থা ব্যবহার করে থাকে।
ইরানের সম্পদ প্রথম জব্দ করা হয় ১৯৭৯ সালে, যখন মার্কিন দূতাবাস জিম্মি সংকটের পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার কঠোর পদক্ষেপ নেন। ১৯৮১ সালের আলজিয়ার্স চুক্তির মাধ্যমে কিছু অর্থ ছাড় দেওয়া হলেও এর বিনিময়ে ৫২ জন জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় নিষেধাজ্ঞা আরও বিস্তৃত হয়।
বর্তমানে বিভিন্ন দেশে ইরানের অর্থ ছড়িয়ে রয়েছে। ধারণা করা হয়, চীনে প্রায় ২০০০ কোটি ডলার, ভারতে ৭০০ কোটি, ইরাকে ৬০০ কোটি, কাতারে ৬০০ কোটি, জাপানে ১৫০ কোটি, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২০০ কোটি এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আরও শত শত কোটি ডলার আটকে আছে।
অর্থনৈতিক সংকট ও উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির মধ্যে এই বিপুল অর্থ ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সম্পদ মুক্ত হলে দেশটির তেল আয়ের অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা, মুদ্রা স্থিতিশীল রাখা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
