মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোর অনুরোধে ইরানে নতুন হামলার পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সোমবার (১৮ মে) এ ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানান, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে তেহরানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর খুব ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।
ট্রাম্প আরও বলেন, মিত্র দেশগুলোর অনুরোধে তিনি ইরানে হামলার পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছেন। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি ভেঙে দিলে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে পাল্টা হামলার হুমকি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর ছয় সপ্তাহ পর ৮ এপ্রিল একটি প্রাথমিক ও অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এরপর থেকে সশস্ত্র সংঘর্ষ অনেকটা কমে এলেও স্থায়ী শান্তিচুক্তি এখনও অনিশ্চিত। কারণ, সম্ভাব্য সমঝোতার শর্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান– উভয় পক্ষই একে অপরের প্রস্তাবে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।
এদিকে সৌদি আরব গতকাল জানিয়েছে, তারা তিনটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। একদিন আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। শান্তি আলোচনা দীর্ঘায়িত হওয়ার মধ্যে এ ঘটনাগুলো উপসাগরীয় অঞ্চলে আবারও সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
ইরানের ওপর নতুন হামলা প্রসঙ্গে ট্রাম্প তার সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে লেখেন, ইরানের সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তাদের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, নইলে তাদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। তবে একই দিন আরেকটি পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান– কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতাদের অনুরোধে ইরানের ওপর নতুন করে বড় হামলার পরিকল্পনা থেকে তিনি সরে এসেছেন। বর্তমানে ‘গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা’ চলছে বলে পোস্টে উল্লেখ করেন ট্রাম্প। তবে তিনি এটাও উল্লেখ করেন, গ্রহণযোগ্য কোনো চুক্তি না হলে মুহূর্তের নোটিশে ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান চালানোর জন্যও প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
সোমবার ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানায়, যুদ্ধ অবসানে সংশোধিত ১৪ দফা শান্তিপ্রস্তাব দিয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ববর্তী প্রস্তাবের জবাব তেহরান ‘মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দিয়েছে’। এদিকে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুদ্ধবিরতির মধ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরান একাধিক প্রস্তাব বিনিময় করেছে, যা ছয় সপ্তাহ ধরে চলা সংঘাতের বেশিরভাগই থামিয়ে দিয়েছে। তবে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এপ্রিল মাসে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত প্রাথমিক সরাসরি আলোচনা অগ্রগতি না হওয়ায় স্থগিত হয়ে যায়।
ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাবের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি। তবে বাঘাই জানান, দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। এর আগে ইরান দাবি করে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলায় যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। পাশাপাশি, ইরানের নৌবন্দরগুলোর ওপর চলমান মার্কিন নৌ-অবরোধের অবসান এবং সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানায়। এর মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত, যেখানে ইসরায়েলি বাহিনী এখনও প্রতিদিন হামলা চালাচ্ছে এবং দক্ষিণাঞ্চলে স্থল অভিযান চালিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে লেবানন সংঘাতও ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে, যেখানে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ অব্যাহত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনায় প্রধান বিরোধের বিষয় হলো ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ। আলোচনার সময় ওয়াশিংটন তেহরানকে তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের আহ্বান জানিয়েছে, তবে তেহরান এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। ধারণা করা হয়, ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি (৯৭০ পাউন্ড) ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে সাধারণত ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রয়োজন হয়। উল্লেখ্য, ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে কখনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ইচ্ছা প্রকাশ করেনি। যুক্তরাষ্ট্র চায় এই মজুদ তাদের হাতে হস্তান্তর করা হোক। তবে ইরান জানিয়েছে, তারা সম্ভব হলে তৃতীয় কোনো পক্ষের কাছে এটি হস্তান্তর করার কথা বিবেচনায় নিতে পারে— তবে সেটাও নিশ্চিত নয়।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ভারতের নয়াদিল্লিতে ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাথে এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান, এই বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ডেডলোক বা অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে ‘সমৃদ্ধ উপাদান’ সংক্রান্ত বিষয়টি আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে এবং আপাতত এটি পরবর্তী পর্যায়ে আলোচনার জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে, যদিও ভবিষ্যতে আবার এটি আলোচনায় আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এখনও বিরোধ করছে এই বিষয়ে— ইরানকে আদৌ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হবে কিনা। জয়েন্ট কমপ্রেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন অনুযায়ী, ২০১৫ সালে একাধিক দেশের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তির অধীনে ইরানকে ৩.৮৭ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল—যা মূলত পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে ২০১৮ সালে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নেন। যদিও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা ধারাবাহিকভাবে জানায় যে, ইরান তখন চুক্তির শর্ত মেনে চলছিল। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরান নির্দিষ্ট সময়ের জন্য (প্রায় ২০ বছর পর্যন্ত) সব ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখুক। এই বিষয়টি দুই দেশের মধ্যে অন্যতম প্রধান অচলাবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিরোধের ক্ষেত্র হলো পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট, যার মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও এলএনজি পরিবাহিত হয়। ইরান কিছু নির্দিষ্ট দেশের জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দিলেও ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সঙ্গে তাদের আলাদা করে আলোচনা করে অনুমতি নিতে হচ্ছে। ইরানের আগের প্রস্তাবগুলোতে এই রুট ব্যবহারের জন্য টোল বা ফি আরোপের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যা ওয়াশিংটন বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে। এছাড়া, এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরে যাওয়া-আসা করা জাহাজগুলোর ওপর নৌ-অবরোধ আরোপ করে, যা বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহে আরও চাপ তৈরি করে। অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, সম্প্রতি ইরান ও ওমানের প্রযুক্তিগত দল বৈঠক করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ নৌযান চলাচলের একটি ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছে।
