দুই সন্তানের মুখে অন্ন তুলে দিতে সৌদি আরবে চাকরির প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন রহিমা (ছদ্মনাম)। ২০২০ সালে মাসে ১ হাজার ৪০০ রিয়াল বেতনের ‘অফিস জবের’ প্রতিশ্রুতি নিয়ে নরসিংদী থেকে সৌদি আরবে যান। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তাকে একটি বিশাল প্রাসাদে কঠোর পরিশ্রম করতে বাধ্য করা হয়, যেখানে মাসে ১ হাজার ১০০ রিয়াল বেতন ছিল।
রহিমা জানান, প্রতিদিন রাত ১টা পর্যন্ত কাজ করতে হতো এবং খাবারের অভাবে তাকে প্রায় সময় উচ্ছিষ্ট খেতে হতো। একদিন ক্ষুধার কারণে বাইরে থেকে খাবার কিনে আনার পর তাকে মারধর করা হয় এবং এক সপ্তাহ তালাবদ্ধ রাখা হয়। পরে, একটি দুর্ঘটনায় তার পা জখম হয় এবং ঠোঁট কেটে যায়, কিন্তু তাকে চিকিৎসা দেয়া হয়নি।
রহিমা দেশে ফেরার আকুতি জানানোর সময় নিয়োগকর্তা রিক্রুটিং এজেন্টের মাধ্যমে জানান যে, তাকে যেতে হলে ১ হাজার ৫০০ রিয়াল দিতে হবে। টাকা দিতে না পারায় বেশ কয়েক মাস তাকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কাজ করতে হয়েছে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় দেশে ফেরেন, তবে শেষ দুই মাসের বেতন পাননি।
এই ঘটনা বিদেশে নারী শ্রমিকদের ওপর চলা কাঠামোগত নির্যাতনের একটি বিস্তৃত চিত্র। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) জানিয়েছে, ২০০৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ১২ দশমিক ৫ মিলিয়নেরও বেশি বাংলাদেশি নারী বিদেশে কাজের উদ্দেশ্যে গেছেন।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্যমতে, ২০১৯ সাল থেকে অন্তত ৬৯ হাজার ৯০ জন নারী শ্রমিক দেশে ফিরেছেন, যাদের অনেকেই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এছাড়া, গত আট বছরে ৭৯৯ জন নারী শ্রমিকের মরদেহ দেশে এসেছে, যার অধিকাংশেই আত্মহত্যার কথা উল্লেখ ছিল।
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ২ হাজার ৩৬টি অভিযোগ জমা পড়েছে, তবে অভিযুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তির নজির খুবই কম। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলেন, অভিযোগগুলো অনেক সময় প্রশাসনিক জটিলতা বা প্রমাণের অভাবে ধামাচাপা পড়ে যায়।
প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নূরুল হক নূর জানান, বর্তমান সরকার অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা ও মর্যাদাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং নতুন গ্রেডিং সিস্টেম চালু করার কথাও জানান।
