হরমুজ প্রণালিতে ইরানের শক্তি ‘মশা নৌবহর’

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের শক্তি ‘মশা নৌবহর’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের নৌবাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি হলেও হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে ইরান। ছোট নৌযান ও দ্রুতগামী বোট ব্যবহার করে মার্কিন বাহিনীকে চাপে রাখছে তেহরান। এসব নৌযান, যা ‘মশা নৌবহর’ নামে পরিচিত, লুকিয়ে থাকে আড়ালে।

‘মশা নৌবহর’ মূলত ছোট, দ্রুতগামী ও ক্ষিপ্র নৌকার একটি বহর, যা জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোরের (আইআরজিসি) মোতায়েন করা এই বহর ইরানের নিয়মিত নৌবাহিনী থেকে আলাদা। উপকূলের গোপন স্থান থেকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে পারে আইআরজিসি, যা হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য প্রধান হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইরান শুক্রবার ঘোষণা করেছে যে, তারা হরমুজ প্রণালিটি খুলে দিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এ ঘোষণা দেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের পক্ষ থেকে প্রণালিটি খুলে দেওয়ার ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন, তবে শান্তিচুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ বহাল থাকবে বলে জানান তিনি।

আইআরজিসি নৌবাহিনী সমুদ্রের গেরিলা বাহিনীর মতো কাজ করে, বড় যুদ্ধজাহাজ ও চিরাচরিত নৌযুদ্ধের ওপর নির্ভর না করে অতর্কিত হামলা চালিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়। জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম এজেন্সির মতে, যুদ্ধ চলাকালীন অন্তত ২০টি জাহাজ আক্রান্ত হয়েছে, যার দায় গার্ডস নৌবাহিনী খুব কমই স্বীকার করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হামলাগুলো সম্ভবত স্থলভাগ থেকে ভ্রাম্যমাণ লঞ্চার থেকে ছোড়া ড্রোনের মাধ্যমে চালানো হয়েছিল। ৮ এপ্রিল, যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর, যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানান, ইরানের প্রধান যুদ্ধজাহাজসহ নিয়মিত নৌবাহিনীর ৯০ শতাংশের বেশি সমুদ্রের তলদেশে ডুবে আছে।

বিশ্লেষকরা বলেন, ছোট নৌকার অস্ত্রশস্ত্র উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য একটি বড় হুমকি। মার্কিন নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত প্রধান অ্যাডমিরাল গ্যারি রাফহেড উল্লেখ করেন যে, গার্ডস নৌবাহিনী বাধাসৃষ্টিকারী শক্তি হিসেবেই রয়ে গেছে।

১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর গার্ডস স্থলবাহিনী গঠন করা হয় এবং ১৯৮৬ সালে গার্ডস নৌবাহিনীকে এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়, নিয়মিত নৌবাহিনী ইরাকের আর্থিক পৃষ্ঠপোষক কুয়েত ও সৌদি আরবের তেল ট্যাঙ্কারগুলোতে হামলা করতে অনিচ্ছুক ছিল, যা পরবর্তীতে মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ায়।

বর্তমানে, গার্ডস নৌবাহিনীতে আনুমানিক ৫০ হাজার সদস্য রয়েছে এবং তারা তাদের বাহিনীকে উপসাগর বরাবর পাঁচটি সেক্টরে বিভক্ত করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, তারা আক্রমণকারী নৌকার জন্য কমপক্ষে ১০টি অত্যন্ত গোপন ও সুরক্ষিত ঘাঁটি নির্মাণ করেছে।

গার্ডস নৌবাহিনী সম্প্রতি বড় ও অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ তৈরি করেছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি যুদ্ধে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোতে উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন কামান এবং অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে, তবে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর আক্রমণ প্রতিহত করার কোনো উপায় নেই।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো সম্ভবত প্রণালির বাইরে অবস্থান করবে, যেখানে তারা জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণ করতে পারবে কিন্তু গার্ডস বাহিনীর পক্ষে তাদের ওপর আক্রমণ করা কঠিন হবে। ইরান ইয়েমেনে তাদের প্রক্সি বাহিনীর মাধ্যমে লোহিত সাগরে অভিযান প্রসারিত করতে পারে বলে সতর্ক করেছে।

গার্ডস নৌবাহিনী মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ইঁদুর-বিড়াল খেলা খেলে আসছে। ২০১৬ সালে, তারা দুটি ছোট মার্কিন নৌ-বোট দখল করে এবং ১০ জন নাবিককে অক্ষত অবস্থায় মুক্তি দেয়।

আরও পড়ুন