ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, অধ্যাদেশ আইন হিসেবে কার্যকর না হওয়ার পেছনে মূলত দুটি কারণ কাজ করছে, একটি আমলাতন্ত্র ও আরেকটি রাজনৈতিক প্রভাব। তিনি বলেন, বর্তমানে অধ্যাদেশ নিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা মূলত অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধের ফল, যার উৎস রাজনৈতিক অঙ্গন।
সোমবার টিআইবি কার্যালয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে প্রণীত কতিপয় অধ্যাদেশ বাতিল ও পরিবর্তন বিষয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, বর্তমান সময়টা দুদকের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। দুদক কখনোই পুরোপুরি কার্যকর ছিল না, তবে বর্তমানে নেতৃত্বের অভাবে প্রতিষ্ঠানটি আরও অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ও জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ বাতিলের দাবি জানিয়েছে টিআইবি। সংগঠনটি জানায়, পুলিশকে একটি জনবান্ধব এবং একটি পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে যে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পুলিশ কমিশন গঠন প্রয়োজন তার কোন প্রতিফলনই অধ্যাদেশটিতে হয়নি।
টিআইবি আরও বলছে, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পুলিশ কমিশনের প্রত্যাশা পদদলিত করে এমনকি ‘স্বাধীন’ বা ‘নিরপেক্ষ’ শব্দগুলো ব্যবহার না করে শুধুমাত্র একটি ‘সংবিধিবদ্ধ সংস্থা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। একইসঙ্গে এর গঠন, কার্যপরিধি ও প্রক্রিয়া সংক্রান্ত বিধানসমূহ এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে প্রস্তাবিত বিএনপি ও সব রাজনৈতিক দলের সম্মতিসহ জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত সুপারিশ ও সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অন্যদিকে এ অধ্যাদেশের বলে যদি পুলিশ কমিশন গঠিত হয় তবে তা হবে সম্পূর্ণভাবে অবসরপ্রাপ্ত পুলিশি ও প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রের কর্তৃত্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠান, যা এ ধরনের কমিশনের মৌলিক উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হবে। পুলিশ কমিশন গঠনে পুলিশ কমিশনের সদস্য হিসেবে একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা (গ্রেড-১) ও একজন সাবেক পুলিশ সদস্যকে (গ্রেড-১) অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ সৃষ্টি এবং সাবেক পুলিশ সদস্যকে কমিশনের সদস্য সচিবের কর্তৃত্ব প্রদান করা হয়েছে।
এভাবে সাবেক পুলিশ সদস্যকে সদস্য-সচিবের কর্তৃত্ব প্রদান করে প্রস্তাবিত কমিশনের চেয়ারপার্সন এবং অন্য কমিশনারদের পদমর্যাদা ও কর্ম-সক্ষমতাকে খর্ব করা হয়েছে। একই সঙ্গে কমিশনের চেয়ারম্যানের পদমর্যাদা তার অবসর গ্রহণের পূর্বের পদমর্যাদার সমরূপ করা এবং সদস্যদের পদমর্যাদা নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারকে প্রদান করা হয়েছে।
পুলিশ কমিশনের চেয়ারপার্সন ও সদস্য নিয়োগের বাছাই কমিটির গঠন ও কর্মপদ্ধতি পরিপূর্ণভাবে আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে, যার ফলে কমিশন গঠন ও কাজে ক্ষমতাসীন সরকারের পরিপূর্ণ কর্তৃত্ব ও স্বার্থের দ্বন্দ্বের ক্ষেত্র সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হয়েছে। সরকারকে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কোনো ব্যক্তি বা সরকারি কর্মচারীকে কমিশনে প্রেষণে নিয়োগ করার এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে।
আরও বলা হয়, জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশটিতে এমন একটি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠনের কথা বলা হয়েছে যে একই সঙ্গে তথ্য আন্তঃপরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে। অর্থাৎ কর্তৃপক্ষ একইসঙ্গে নিয়ন্ত্রক ও সেবা দাতা, যা স্বার্থের সংঘাত তৈরি করবে। ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ আলোকে সব প্রকার উপাত্তের (ডেটা) ব্যবস্থাপনা, আন্তঃপরিচালন এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আলাদা এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে অর্পণ করা হয়েছে জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের হাতে।
জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তার দায়িত্ব পালন ও কার্যসম্পাদনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবে বলা হলেও এই কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা বাছাই করবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন একটি কমিটি। কর্তৃপক্ষ একইসঙ্গে অধ্যাদেশটির অধীনে নিজেকে একটি আন্তঃপরিচালন গেটওয়ে ও পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। অর্থাৎ কর্তৃপক্ষ নিজেইে একটি ডেটা পরিচালন অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে, যা সুস্পষ্ট স্বার্থের দ্বন্দ্বযুক্ত পরিবেশ তৈরি করবে।
