তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক পথ

তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক পথ

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের প্রায় দুই বছর পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতা তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি দেশে রাজনৈতিক পুনর্গঠন ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক পুনঃসমন্বয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

২০২৪ সালে বিক্ষোভকারীদের ওপর দমনপীড়নের পর শেখ হাসিনার পতন ঘটে, যাতে প্রায় এক হাজার ৪০০ জন নিহত হন। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে দিল্লিতে আশ্রয় নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার অনুপস্থিতিতে বিচার শেষে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের অনুরোধ সত্ত্বেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানায়, যা দুই দেশের সম্পর্ককে জটিল করে তোলে। বিশ্লেষকরা এই নির্বাচনকে দীর্ঘদিনের দমনপীড়নের বিরুদ্ধে বৈধ অভ্যুত্থান ও শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি নয়াদিল্লির সমর্থনের প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখছেন।

শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখলেও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বিস্তৃত করেন। বিরোধী নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ ছিল। আঞ্চলিক কূটনীতিতে তার সরকার ভারতের দিকে ঝুঁকে ছিল, যা তার ১৫ বছরের শাসনামলে নয়াদিল্লিতে সাতবার দ্বিপাক্ষিক সফরকে প্রতিফলিত করে।

সমালোচকদের মতে, এই কূটনৈতিক ছন্দ এমন পররাষ্ট্রনীতির প্রতীক, যেখানে ভারতের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশে সক্রিয় ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয় ও দুই দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান চালু করে।

বাংলাদেশি ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যাতায়াতের সুযোগ দেওয়া হলেও তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি অমীমাংসিত থেকে যায়। সীমান্তে হত্যাকাণ্ডও বন্ধ হয়নি। জ্বালানিখাতে বাংলাদেশ ক্রমেই ভারতীয় বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বড় অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ প্রকল্প দ্রুত অনুমোদিত হলেও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল।

ক্ষমতাচ্যুতির পর শেখ হাসিনার দিল্লিতে আশ্রয় নেওয়া কূটনৈতিক ধারণাকে জোরালো করে। বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার পর তারেক রহমান তিন দশকের মধ্যে বাংলাদেশের প্রথম পুরুষ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায় কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছেন।

সম্প্রতি এক সমাবেশে তিনি বলেন, ‘নট দিল্লি, নট পিণ্ডি- বাংলাদেশ সবার আগে।’ শেখ হাসিনার বিদায়ের পর অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। ১৪ বছর পর করাচিতে সরাসরি ফ্লাইট চালু হয় ও ১৩ বছর পর পাকিস্তানি মন্ত্রীরা সফরে আসেন। সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা পুনরায় শুরু হয় এবং বাণিজ্য ২৭ ভাগ বৃদ্ধি পায়।

বিশ্লেষক স্মৃতি পট্টনায়ক বিবিসিকে বলেন, হাসিনার আমলে ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা প্রায় অনুপস্থিত ছিল। দোলক ভারতের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকেছিল, এখন বিপরীত দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ার ঝুঁকি আছে। তারেক রহমান দিল্লি ও ইসলামাবাদ উভয় রাজধানী থেকে শুভেচ্ছা বার্তা পেয়েছেন।

শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণে ভারতের অস্বীকৃতি রাজনৈতিক অস্বস্তি তৈরি করেছে। দেশে এখনো ভারতবিরোধী মনোভাব প্রবল। বহু মানুষের চোখে ভারত বহিরাগত প্রভাবের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তবে অনেকে বাণিজ্য, জ্বালানি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন।

তারেক রহমানের বড় চ্যালেঞ্জ হবে স্বাধীন অবস্থান বজায় রেখে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখা। এই নির্বাচনি রায় দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন ভাবনার দরজা খুলেছে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা। অঞ্চলটি আর কোনো এক শক্তির ‘পিছনের উঠান’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।

বাংলাদেশ সম্ভবত ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবে, তবে একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়াবে। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণও এই পরিবর্তনের অংশ হতে পারে। মূল বার্তা হলো বাংলাদেশ নিজস্ব স্বার্থের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির দায়িত্ব হবে বিকল্প সম্প্রসারণ, একক নির্ভরতা এড়ানো এবং ঢাকার কণ্ঠস্বরকে আরও দৃঢ় করা। নতুন নেতৃত্বের অধীনে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় আরও আত্মবিশ্বাসী ও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে। বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে পুরোনো সম্পর্কগুলো পুনর্মূল্যায়ন করে দেশটিকে আর অবহেলা করা যাবে না বলে জানিয়ে দিতে পারে।

আরও পড়ুন