পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির সাফল্যের পেছনে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএসের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা চলছে। সংঘ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে যে তারা নির্বাচনী রাজনীতি থেকে দূরে থাকে, তবে এবারের নির্বাচনে তারা আগের চেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রকাশ্যে মাঠে নামা থেকে বিরত থাকলেও এবার আরএসএস ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো তৃণমূল স্তরে পুরো শক্তি নিয়ে নেমেছিল।
আরএসএসের এক প্রচারক বিবিসিকে জানিয়েছেন, এবারের নির্বাচনে শত শত স্বয়ংসেবক ও কর্মী একটাই বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন—এই নির্বাচনের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু সমাজের ‘অস্তিত্বের’ প্রশ্ন রয়েছে। সমালোচকরা মনে করেন, নির্বাচনের সঙ্গে ‘অস্তিত্বের লড়াই’ বলে ধর্মীয় মেরুকরণ তীব্র করা হয়েছে।
আরএসএসের প্রাথমিক কেন্দ্রগুলো ‘শাখা’ নামে পরিচিত। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে সংঘের প্রায় সাড়ে চার হাজার শাখা সক্রিয়, যা দশ বছর আগে ছিল মাত্র এক হাজারের কাছাকাছি। শাখাগুলোর মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদে মতাদর্শগত প্রভাব বিস্তার করা হয় বলে সমালোচকরা যুক্তি দেন। সংঘ অবশ্য এটা অস্বীকার করে, তবে নির্বাচনের সময় তৃণমূল স্তরে স্বয়ংসেবকদের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।
সংঘের ‘প্রান্ত ব্যবস্থা প্রমুখ’ সীতারাম দাগা বলেন, স্বয়ংসেবকরা বাড়ি-বাড়ি গিয়ে জনগণকে ভোট দেওয়ার আবেদন জানান, তবে কোনো দলের নাম নেন না। তিনি বলেন, ‘আমরা এটা জানাই যে, দেশের স্বার্থে যারা কাজ করছে, রাষ্ট্রীয় স্বার্থে কাজ করছে, যারা হিন্দুত্বের জন্য কাজ করছে, যারা সমাজের সেবা করছে, আপনারা তাকেই নির্বাচিত করুন।’ তবে তিনি স্বীকার করেন, সংঘের স্বয়ংসেবকরা বিজেপিতেও থাকায় কিছু কথাবার্তা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির জয়ের পেছনে শাসক-বিরোধী ক্ষোভ বড় কারণ হলেও আরএসএসের সমর্থন ছাড়া এত বড় জয় সম্ভব ছিল না। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার বলেন, সংঘ তৃণমূল স্তরে সুশাসন ও জাতীয়তাবাদের পক্ষে কাজ করেছে, আর বিজেপিও জাতীয়তাবাদী দল হওয়ায় সংঘ স্বাভাবিকভাবেই তাদের সমর্থন দিয়েছে।
আরএসএসের প্রবীণ প্রচারক বিজয় আঢ্য বলেন, এবারের নির্বাচন হিন্দু সমাজের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, ‘সংঘের কর্মীরা ঘরে-ঘরে গিয়ে বলেছে যে বাংলাদেশের হিন্দুদের যে অবস্থা হয়েছে, একই পরিস্থিতি পশ্চিমবঙ্গেও হবে। পশ্চিমবঙ্গই বাঙালি হিন্দুদের একমাত্র মাতৃভূমি, তাই এখান থেকে তৃণমূল কংগ্রেসকে সরিয়ে দেওয়া উচিত।’
কলকাতার প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জাদ মাহমুদ বলেন, এই নির্বাচনে ধর্মীয় মেরুকরণ স্পষ্ট দেখা গেছে এবং মানসিকতার পরিবর্তনে আরএসএসের বড় ভূমিকা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আরএসএস মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার করে, যা শেষ পর্যন্ত বিজেপির রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডাকে সহায়তা করে।’
এখন বিজেপি সরকার গঠন করায় সংঘের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা মনে করেন পশ্চিমবঙ্গে ভয়ের পরিবেশ কমেছে এবং আগামী দিনে আরও মানুষ সংঘের কর্মসূচিতে যুক্ত হবেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংঘের কাজ সরকার গঠনের ওপর নির্ভর করে না; বিজেপি ক্ষমতায় থাকুক বা বিরোধী পক্ষে, সংঘ তাদের মতাদর্শগত ও সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যায়।
