এক বছরের ব্যবধানে আবারও পুলিশের পোশাকের রঙ পরিবর্তন করেছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জেলা পুলিশ ও অন্যান্য ইউনিটের সদস্যদের শার্ট হবে গাঢ় নীল, মহানগর পুলিশের শার্ট হবে হালকা জলপাই রঙের। সবার জন্য প্যান্ট হবে খাকি রঙের। তবে বারবার পোশাক পরিবর্তনকে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় উল্লেখ করে অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, বাহিনীর ভাবমূর্তি ও জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে সবচেয়ে জরুরি গুণগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।
মূলত, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও গুলিতে প্রাণহানির ঘটনার পর পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের দাবি ওঠে। অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশ, র্যাব ও আনসারের পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। গত বছরের জানুয়ারিতে তিন বাহিনীর জন্য নতুন পোশাক নির্ধারণ করা হলেও শেষ পর্যন্ত পরিবর্তন করা হয় শুধু পুলিশের পোশাক।
তবে নতুন পোশাকের রঙ নিয়ে শুরু থেকেই পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। সরকার পরিবর্তনের পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। পুলিশ সদস্যরা আগের পোশাকে ফেরার দাবি জানালে সরকার তা আমলে নিয়ে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করে।
নতুন প্রজ্ঞাপনে শার্ট ও প্যান্টের পাশাপাশি জার্সি, কার্ডিগান, পুলওভার, জ্যাকেট, নারী সদস্যদের পোশাক, মাথার আবরণ এবং পূর্ণহাতা পোশাকের রং–সংক্রান্ত বিধানেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
তবে নতুন পোশাক মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগবে। পুলিশ সদর দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, দ্রুতই নতুন পোশাকের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু হবে। পুলিশ সদর দফতরের ডিআইজি (লজিস্টিকস) সারোয়ার মোর্শেদ শামীম বলেন, “এই অর্থবছর শেষ হয়েছে, এখন নতুন অর্থবছর শুরু হয়েছে জুলাই থেকে। তখন আমরা এটি প্রস্তুত করি এবং টেন্ডারে যাই। এরপর টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করে সরবরাহ দিতে কিছুটা সময় লাগে।”
এদিকে বিশ্লেষকদের মতে, বারবার পোশাক পরিবর্তন বাহিনীর ভাবমূর্তি পরিবর্তনের কার্যকর উপায় নয়। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে না। সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, “পুলিশের বিরুদ্ধে অতীত ও বর্তমান সময়ে যেসব অভিযোগ রয়েছে, সেগুলো থেকে মুক্ত থেকে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাকে সামনে রেখে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকে পেশাগত মান বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন।” তিনি আরও বলেন, “শুধু পোশাক বা বাহ্যিক পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে যদি পুলিশের কর্মপরিধি ও কর্মপরিচয়ে বাস্তব পরিবর্তন আনা যায়, তাহলে তা আরও বেশি গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর হবে।”
তাদের মতে, মানুষের নেতিবাচক মনোভাব দূর করতে শুধু পোশাক বা নাম পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন জবাবদিহি, পেশাদারিত্ব ও সেবার মান উন্নয়ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, “পোশাকের দিকে ধাবিত না হয়ে বরং এখানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করাই মূল বিষয় হওয়া উচিত। একই সঙ্গে কেউ যদি অপরাধ করে, তাকে কীভাবে বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা যায়—সে বিষয়গুলো নিয়েই আলোচনা হওয়া দরকার।” তিনি আরও বলেন, “কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় একেকটি সরকার আসে এবং হঠাৎ করে পরিকল্পনা নেয়, পরে সেটি বাস্তবায়ন করে আবার পরিবর্তন আনা হয়। বড় সমস্যা হলো, কোনো কিছু পরিবর্তন করতে গেলে তা একপাক্ষিকভাবে করা যায় না; এর জন্য একটি সমষ্টিগত ও সামগ্রিক (হোলিস্টিক) পদ্ধতি থাকা প্রয়োজন।” সেজন্য বারবার পোশাক পরিবর্তনের বদলে বাহিনীর দক্ষতা, জবাবদিহিতা ও পেশাদারিত্ব বাড়ানোর দিকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে মনে করছেন তারা।
