ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পর গত শনিবার রাজ্য সরকারের দায়িত্ব নেয় বিজেপি। সোমবার এই সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের আন্তর্জাতিক সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই বেড়া নির্মাণের জন্য ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফকে ৪৫ দিনের মধ্যে জমি বুঝিয়ে দেওয়া হবে বলে বৈঠক শেষে জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্যমতে, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের দুই হাজার ২১৬ কিলোমিটারের সীমান্ত রয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় ছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। ২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। সেই সময়ে একাধিক সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সাথে বাংলাদেশের বিজিবি বা এলাকার বাসিন্দাদের সাথে উত্তেজনা দেখা যায়।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরই সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া সংক্রান্ত তৎপরতা নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে ক্ষমতাসীন বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে, এর উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে বাংলাদেশের জনগণকে ‘ভয় দেখানো যাবে না’ বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সীমান্তে কাঁটাতার দেওয়া পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নিজস্ব বিষয়। তবে সীমান্তে অনুপ্রবেশ রোধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিজিবি সার্বক্ষণিক সতর্ক রয়েছে বলেও জানান তিনি। কোনো অঙ্গরাজ্য নয়, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ আছে বাংলাদেশের, এই মন্তব্যও করেছেন তিনি।
এদিকে, বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বলছে, এই বেড়া নির্মাণের মাধ্যমে ‘বিভেদের দেওয়াল’ তৈরি করছে ভারত, যে কারণে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই উদ্যোগে নজর রাখছে তারা। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য চার হাজার ৯৬ দশমিক ৭ কিলোমিটার। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি নাগাদ তাদের তথ্যে বলা আছে, এই সীমান্তের ৮৬৪ কিলোমিটার বেড়া নির্মাণ বাকি রয়েছে। এর মধ্যে ১৭৪ কিলোমিটারেরও বেশি অংশে জমি অধিগ্রহণ ও ভূমিধস সমস্যা এবং কিছু এলাকায় জলাভূমি রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ”কাঁটাতার দিয়ে বাংলাদেশের মতো দেশকে এখন ডর দেখানোর মতো কোনো জায়গা নাই।” ”বাংলাদেশের মানুষ কাঁটাতার ভয় পায় না। বাংলাদেশের সরকারও কাঁটা তার ভয় পায় না। যেখানে আমাদের কথা বলা দরকার, আমরা কথা বলবো,” বলেন তিনি। তিনি আরো বলেন, ”সীমান্তে ভারতেরও দেখাতে হবে মানবিক অ্যাপ্রোচ, ডিলিং উইথ সিকিউরিটি। এখানে যদি গুলি মেরে মানুষ হত্যা করা হয় বা তারে ঝুলাইয়া ফেলে রাখবেন, যেগুলো আমরা দেখছি হাসিনার সময়, ওই নমুনায় বর্ডার আর কোনোদিন ইনআল্লাহ আসবে না।” ”আর ওই নমুনায় যদি কেউ বর্ডার করতেও চায় তাহলে এই বাংলাদেশ সেই বাংলাদেশ না যে বসে বসে দেখবে। এই বাংলাদেশের পরিকল্পনা আছে, কি করতে হবে। ইনশাআল্লাহ আশা করি ওই পথে যাবে না,” বলেন মি. কবির।
বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী বলছে, ভারতের এই কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ নতুন না, তবে এটি যদি বাংলাদেশের মর্যাদাহানির কারণ হয় তাহলে সেটি নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া দেবে তারা। দলটির কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ”কাঁটাতারের বেড়া যদি তাদের নিজস্ব নিরাপত্তার জন্য দেয় সেই অধিকার তাদের আছে। তবে বেড়া দেওয়ার উদ্দেশ্য যদি হয় আরেকটা রাষ্ট্রের মর্যাদাহানি বা অন্যের ভূমি দখল, তাহলে সেটি হবে বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত, আরেকটি রাষ্ট্রের ওপর হস্তক্ষেপ”। তিনি বলেন, বিরোধী দল এই বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রেখেছে। ভারতের এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের নিরাপত্তায় যদি কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটে, তাহলে বিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবে নীরব থাকবে না জামায়াতে ইসলামী।
শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভারতবিরোধী অবস্থান নিয়ে সরব হতে দেখা গেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির নেতাদের অনেককে। দলটি মনে করছে, পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকারের সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার সিদ্ধান্তটি যতটা না নিরাপত্তার, তার চেয়েও বেশি রাজনৈতিক। এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বিবিসি বাংলাকে বলেন, ”বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোও এটা নিয়ে কথা বলছে। কিন্তু বিজেপি শুরু থেকে এটা নিয়ে তোয়াক্কা করছে না”। ”কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে তারা আমাদের এখানে বিভেদের দেওয়াল তুলতেছে। আমরা মনে করি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত এবং এটির সম্মানজনকভাবে সমাধান সম্ভব,” যোগ করেন তিনি। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স মনে করেন, উদ্দেশ্য যদি হয় অনুপ্রবেশ বন্ধ, সেটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঠেকানো কঠিন। তিনি বলেন, ভারতের সাথে অনেক সমস্যা আছে সেগুলো আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।
