আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মা হাসি আক্তারের হৃদয়বিদারক সাক্ষ্য

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মা হাসি আক্তারের হৃদয়বিদারক সাক্ষ্য

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ মঙ্গলবার জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন রাজধানীর রামপুরায় ২৮ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এদিন তিন নম্বর সাক্ষী হিসেবে শহীদ রাকিবের মা হাসি আক্তারের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়, যা ট্রাইব্যুনালে হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি করে।

হাসি আক্তার জানান, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নিতেন তার ছেলে রাকিব। ১৯ জুলাই সকালে সকালের নাশতা দিতে গিয়ে রাকিবকে না পেয়ে খোঁজা শুরু হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই আসে রাকিব গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর। তিনি ও তার মেয়ের জামাই নুরে আলম রিকশা নিয়ে রামপুরার আফতাবনগর নাগরিক হাসপাতালে ছুটে যান।

সেখানে জানা যায়, আফতাবনগর গেটের সামনে রামপুরা ব্রিজের ঢালে রাকিবকে গুলি করা হয়েছে, যেখানে বন্ধুদের নিয়ে সে আন্দোলন করছিল। রাকিবের পেটে গুলি লাগায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে আইসিইউতে নেওয়ার পর হাসি আক্তার বাধা উপেক্ষা করে ঢুকে রাকিবকে অচেতন অবস্থায় দেখতে পান। তিনি তার কপালে ও গালে চুমু দিয়ে বলেন, ‘তোমার কিছু হবে না’।

এর মধ্যেই রাকিবের জন্য তিন ব্যাগ রক্ত আনা হয়, কিন্তু হাসপাতাল থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, ‘রক্ত আর লাগবে না, রাকিব মারা গেছেন।’ এ কথা বলেই ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীর ডায়াসে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন হাসি আক্তার। তিনি আরও জানান, আইসিইউ থেকে বের করে রাকিবের লাশ মর্গে পাঠানো হয় এবং সেখানে সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত হয়। ২১ জুলাই ছেলের লাশটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের বুঝিয়ে দেয়।

ট্রাইব্যুনালে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর রাকিবকে রিকশায় করে হাসপাতালে নেওয়ার ৩৩ সেকেন্ডের একটি ভিডিও প্রদর্শন করা হয়, যা হাসি আক্তারের সংরক্ষণে ছিল। ভিডিওতে দেখা যায়, মেরুন রঙের টি-শার্ট ও নীল রঙের জিন্স প্যান্ট পরা রাকিব গুলিবিদ্ধ হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে আছে এবং সহযোদ্ধারা তাকে তুলে রিকশাযোগে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে হাসি আক্তার বলেন, ‘আমার ছেলে হত্যার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, কর্নেল রেদওয়ান, ওসি মশিউর, এডিসি রাশেদ, মেজর রাফাতসহ জড়িতদের দায়ী করছি। তারা শুধু আমার ছেলেকেই হত্যা করেনি, আরও বহু আন্দোলনকারীকে হত্যা করেছে। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।’

মামলায় মোট আসামির সংখ্যা চারজন। এর মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে ঢাকা সেনানিবাসের বিশেষ কারাগারে থাকা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদওয়ানুল ইসলাম ও মেজর মো. রাফাত বিন আলমকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান এখনো পলাতক রয়েছেন।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। তার সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান, মামুনুর রশীদসহ অন্যরা। ট্রাইব্যুনাল এ মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ১৫ এপ্রিল দিন ধার্য করেছেন।

আরও পড়ুন