ক্যারিবিয়ানের দারিদ্র্যপীড়িত দেশ হাইতিতে ইসলাম ধর্ম ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে। ভোদো ও ক্যাথলিক খ্রিস্টধর্মের মিশ্রণের জন্য পরিচিত এই দ্বীপে এখন ছোট হলেও ক্রমবর্ধমান মুসলিম জনগোষ্ঠী দেখা যাচ্ছে। রাজধানী পোর্ট অব প্রিন্সের ডেলমাস রোডের কোণে মসজিদ আল-ফাতিহা। সবুজ সাইনবোর্ডে ইংরেজি ও আরবি হরফে নাম লেখা। গেটে কর্মী পানি ছিটিয়ে দর্শনার্থীদের স্বাগত জানান ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে।
দেশটির প্রধান ইসলামী সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৮০ লাখ মানুষের এই দেশে বর্তমানে মুসলমানের সংখ্যা ৪ থেকে ৫ হাজার। রাজধানীতে দুটি প্রধান ইসলামী কেন্দ্র রয়েছে। ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারীদের হাত ধরে সারা দেশে প্রায় ডজনখানেক মসজিদ ও ইসলামী কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। সম্প্রতি মুসলিমরা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছেন। টুপি ও দাড়িওয়ালা পুরুষ এবং হিজাব পরা নারীদের এখন হাইতির বেশ কয়েকটি শহরের রাস্তায় দেখা যায়।
উত্তরাঞ্চলীয় শহর সান রাফায়েল থেকে আসা নাওন মার্সেলুস সম্প্রতি হাইতির পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের প্রথম মুসলিম সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। আল-ফাতিহা মসজিদের ইমাম আব্দুল আলী জানান, তিনি ১৯৮৫ সালে হাইতিতে ইসলামের দাওয়াত দিতে আসেন। কানাডায় ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ১৯৯৩ সালে মসজিদের জায়গাটি কিনেন।
অর্থনৈতিক মন্দা, অপুষ্টি, রাজনৈতিক সহিংসতা ও সংকটের কারণে হাইতির মানুষ চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছে। এই দারিদ্র্যপীড়িত দেশে ইসলামের দানশীলতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের নীতি নতুন ধর্মান্তরকারীদের আকর্ষণ করছে। কারফুর ফেইলস সেন্টারের ইমাম রাসিন গঙ্গা বলেন, ‘হাইতিয়ান এবং মুসলিম হিসেবে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ববোধ মানুষের হৃদয়ে দ্রুত জায়গা করে নিয়েছে।’
আলজেরীয় অর্থনীতিবিদ ইয়াসিন খোল্লাদির জরিপে দেখা যায়, ইসলামের সামাজিক ন্যায়বিচার, শিক্ষার প্রসার ও সাম্যতাবোধ হাইতির সংকট সমাধানের পথ দেখাতে পারে। তিনি বলেন, ‘ইসলামে ব্যবসা-বাণিজ্য, ভূমির বিরোধ মীমাংসা ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার সুন্দর সমাধান রয়েছে।’ হাইতিতে ইসলামের চর্চা দেশটির ইতিহাস নিয়ে নতুন তত্ত্বের জন্ম দিয়েছে। ডেলমাস মসজিদের মুসল্লি সামাকি ফুসাইনি দাবি করেন, বিপ্লবী বুকম্যান ভোদো পুরোহিত ছিলেন না, তিনি ছিলেন মুসলিম। জ্যামাইকা থেকে আসায় ইংরেজিতে তার নাম বুকম্যান বা বইয়ের মানুষ; তিনি সবসময় একটি বই পড়তেন, যাকে ফরাসি শাসকরা উল্টো বই বলতেন, কারণ সেটি ছিল পবিত্র কোরআন।
হাইতির মসজিদগুলো স্থানীয় অর্থায়নে চলে, বিদেশ থেকে কোনো আর্থিক সহায়তা পায় না। তবে ১৯৯৪ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনীর মাধ্যমে নতুন ধর্মাবলম্বীরা অনুপ্রেরণা পায়। ইমাম আলী জানান, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে আসা পাকিস্তানি ও বাংলাদেশি সৈন্যরা মসজিদে নামাজ পড়তে আসতেন এবং দ্বীনি আলোচনা করতেন। ভোদো ও ক্যাথলিক প্রধান এই দেশটিতে মুসলমানরা সংখ্যালঘু হওয়ায় তারা ইসলামের শান্তিপূর্ণ রূপ তুলে ধরার চেষ্টা করেন। ইমাম রাসিন গঙ্গা বলেন, ‘মহান আল্লাহ বলেছেন, কেউ অন্যায়ভাবে হত্যা করলে পুরো মানবজাতিকে হত্যা করল। নিউইয়র্কের হামলাকারীরা মানুষের কাতারেই পড়ে না। মুসলিমদের উচিত ভালোবাসার শক্তি দিয়ে মন জয় করা। সহিংসতা কখনো সমাধান এনে দেয় না।’
