দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকটের প্রভাবে উত্তরাঞ্চলের কৃষিতে পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। গাইবান্ধার কৃষকরা সেচের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল না পেয়ে হিমসিম খাচ্ছেন। বাধ্য হয়ে দ্বিগুণ দামে ডিজেল কিনতে হচ্ছে, যা খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া ধানে ব্লাস্ট রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় কৃষকরা ত্রিমুখী সংকটে পড়েছেন।
কৃষি সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে কৃষি খরচ বাড়ছে। জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিশেষ করে ডিজেলচালিত শ্যালো মেশিননির্ভর চাষিরা বেশি বিপাকে আছেন। ধানে ব্লাস্ট রোগ শুরু হওয়ায় কৃষকদের দুশ্চিন্তা বেড়েছে। তারা সমাধান পেতে কৃষি কর্মকর্তা ও কীটনাশকের দোকানে দৌড়াচ্ছেন।
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে জেলার সাত উপজেলায় ১ লাখ ২৯ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই জমিতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ২৫ হাজার ৫৮৫ মেট্রিক টন ধান।
সদর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়নে সরেজমিনে দেখা গেছে, মাঠে মাঠে সবুজ ধানক্ষেত। অধিকাংশ জমিতে ধানের শীষ বের হয়েছে। রাধাকৃষ্ণপুর গ্রামে এসকেএস ইন সংলগ্ন একাধিক ধানের জমি ব্লাস্টে আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্ত অংশের ধান গাছের শীষ সাদা হয়ে গেছে এবং তাতে দানা নেই।
ব্লাস্ট আক্রান্ত জমির মালিক শরিফুল ইসলাম বলেন, তিন বিঘা জমিতে ব্রি-২৮ চাষ করেছি, কিন্তু ব্লাস্টে আক্রান্ত হওয়ায় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। কৃষি অফিসের লোক জমি দেখে স্প্রে করার পরামর্শ দিয়েছে। তিনি জানান, আমনে জলাবদ্ধতায় সব জমির ক্ষেত নষ্ট হয়েছিল, এখন ব্লাস্টে চরম ক্ষতি হচ্ছে।
বর্গাচাষী রিয়াদ সরদার বলেন, ডিজেলচালিত মেশিনে ধানের আবাদ করি। এবার তেল সংকটের কারণে খরচ দ্বিগুণ হয়েছে। তারপরও ব্লাস্টে আক্রান্ত হয়েছে জমি। আমরা কোনো প্রণোদনা পাইনি।
ধান চাষি শাহারুল আলম বলেন, দেড় বিঘা জমিতে ধানের আবাদ করেছি। পাশের জমিতে ব্লাস্ট লেগেছে, দুশ্চিন্তায় আছি। ব্লাস্ট দেখে একবার স্প্রে করেছি, আবার স্প্রে করতে হবে, যা খরচ বাড়াচ্ছে।
গাইবান্ধা শহরের আর রহমান পাম্পে ডিজেল নিতে কৃষক-কৃষাণীর দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা কৃষকরা বোতল ও জারিকেন নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। প্রচণ্ড রোদে তারা নাজেহাল অবস্থায় আছেন।
কৃষকদের অভিযোগ, পেট্রোল পাম্পে চাহিদা মতো তেল দেয় না। খুচরা দোকানে ডিজেল পাওয়া গেলেও দাম দ্বিগুণ। এতে নিয়মিত সেচ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে, যা ফসল উৎপাদনে শঙ্কা তৈরি করেছে।
ফুলছড়ি উপজেলার রাশেদা বেগম বলেন, পাঁচবিঘা জমিতে ভুট্টার আবাদ করেছি। চরে কারেন্ট নেই, এখন তেল নেই, তাই তেল নিতে এসেছি। সাদুল্লাপুর উপজেলার খাইরুল ইসলাম বলেন, তিন বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছি, তেল সংকটে আবাদ ভালো হবে না মনে হয়।
পলাশবাড়ী উপজেলার বাবলু মন্ডল বলেন, দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। গ্রামে ১ লিটার তেল ১৫০ টাকা পর্যন্ত নেয়। তিনি ৪ বিঘা জমিতে ধান রোপণ করেছেন।
বোয়ালী ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা কুলসুম বলেন, আগাম ধান লাগানো কিছু জমিতে ব্লাস্ট রোগ দেখা দিয়েছে। আবহাওয়াজনিত কারণে রোগটি হয়ে থাকে। আক্রান্ত জমি পরিদর্শন করে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাদেকুল ইসলাম ব্লাস্ট আক্রান্ত এলাকা জেনে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসনের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন। তিনি তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেননি।
