বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ৩ বছরে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি কমে অর্ধেক

বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ৩ বছরে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি কমে অর্ধেক

বাংলাদেশের বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা গত তিন বছরে উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি ছিল ২ হাজার ৭৪ জন। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে যা প্রায় ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৮ জন।

কর্মকর্তা ও মেডিকেল কলেজ মালিকেরা জানান, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপড়েনের কারণে ভারতীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় এই অবস্থা দাঁড়িয়েছে। দেশের চিকিৎসাশিক্ষা ব্যবস্থার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাব, ভারতের বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ফি উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়া এবং সেখানে মেডিকেল কলেজগুলোর ভর্তি সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়াও এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী, যোগ করেন তারা।

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের বেসরকারি মেডিকেল কলেজে বিদেশি শিক্ষার্থীদের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি ভারতীয় নাগরিক। বাংলাদেশের ৭২টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের প্রত্যেকটিকে মোট আসনের ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে এসব কলেজে মোট ৬ হাজার ২৭৮টি আসন ছিল, অর্থাৎ ২ হাজার ৮০০ জনেরও বেশি বিদেশি শিক্ষার্থীর ভর্তির সুযোগ ছিল। কিন্তু ভর্তি হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৯৮ জন।

সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে সার্কভুক্ত দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য ১২৫টি এবং অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য ৯৯টি আসন সংরক্ষিত রয়েছে। চলতি শিক্ষাবর্ষে সার্কভুক্ত দেশ থেকে ১০৬ জন এবং ‘অন্যান্য অঞ্চল’ কোটায় মূলত ফিলিস্তিনের প্রায় ২০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা কমে যাওয়ার দুটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন—বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপড়েনের প্রেক্ষাপটে নেতিবাচক প্রচারণা এবং ভারতে চিকিৎসাশিক্ষার সুযোগের ব্যাপক বৃদ্ধি। তিনি বলেন, ভারতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রচারণা শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশে চিকিৎসাশিক্ষা নিতে নিরুৎসাহিত করেছে। একই ধরনের প্রচারণার কারণে নেপাল থেকেও শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ থেকে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজগুলোতে ভর্তি হওয়া বিদেশি শিক্ষার্থীদের ৬৮ থেকে ৭২ শতাংশই ছিল ভারতীয়। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে এই হার ৪৪ শতাংশে নেমে আসে। ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে ১ হাজার ৯৯২ জন বিদেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে ১ হাজার ৪৩২ জনই ছিলেন ভারতীয়। গত শিক্ষাবর্ষে ১ হাজার ১৫৬ জন বিদেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে ভারতীয় ৫০৭ জন।

মোয়াজ্জেম আরও বলেন, অ্যাসোসিয়েশন নেপালে প্রচারণা চালিয়ে এই শিক্ষাবর্ষে সেখান থেকে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে। তবে আগের বছরের তুলনায় ভারতীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা এখনো কম। ২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০১৪ সালে ভারতে মেডিকেল কলেজের সংখ্যা ছিল ৩৮৭টি। ২০২৫ সালে সেটি বেড়ে ৮১৯টি হয়েছে। একই সময়ে স্নাতক পর্যায়ের আসন ৫১ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ ২৯ হাজার এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ৩১ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৭৮ হাজার করা হয়েছে।

ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাইয়ে ভারতের ন্যাশনাল মেডিকেল কমিশন নির্দেশ দিয়েছিল, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও ডিমড ইউনিভার্সিটির ৫০ শতাংশ আসনের ফি সরকারি মেডিকেল কলেজের সমপর্যায়ে নির্ধারণ করতে হবে। ফলে অনেক শিক্ষার্থীর ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়।

চিকিৎসাশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নাজমুল হোসেন মনে করেন, সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজের স্বীকৃতিদাতা কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ মেডিকেল এডুকেশন অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের (বিএমইএসি) আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না থাকা বিদেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার একটি কারণ। সম্প্রতি তিনি বলেন, ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেডিকেল এডুকেশন (ডব্লিউএফএমই) এখনো বিএমইএসিকে স্বীকৃতি দেয়নি। এছাড়া ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে কিছু বিদেশি শিক্ষার্থী নিরুৎসাহিত হতে পারে।

বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়াতে সরকার ইতোমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। অধ্যাপক নাজমুল বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে, ফলে আশা করা যাচ্ছে, ভারতীয় শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা বাড়বে। বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করতে পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী, বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তি সহজ করতে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্তও শিথিল করার পরিকল্পনা চলছে, যোগ করেন তিনি।

বিএমইএসির রেজিস্ট্রার অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর তালুকদার বলেন, কাউন্সিল ডব্লিউএফএমইর সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করছে এবং ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। ‘আমরা আশা করছি শিগগিরই ডব্লিউএফএমইর স্বীকৃতি পাব। পেলে আরও বেশি বিদেশি শিক্ষার্থী আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে,’ বলেন তিনি। তিনি জানান, কাউন্সিল এ পর্যন্ত চারটি সরকারি ও একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আরও ১৩টি কলেজ—যার অধিকাংশই বেসরকারি, এগুলোর স্বীকৃতির বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।

বাংলাদেশ ও ভারতের চিকিৎসাশিক্ষার পাঠ্যক্রমে মিল রয়েছে উল্লেখ করে অধ্যাপক মোয়াজ্জেম বলেন, ‘ভারত এখনো আমাদের জন্য বিদেশি শিক্ষার্থীর অন্যতম প্রধান উৎস হতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, অ্যাসোসিয়েশন আগামী মাসে ভারতে প্রচারণা শুরু করবে এবং ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো নতুন বাজার অনুসন্ধান করবে। মোয়াজ্জেম উল্লেখ করেন, অতীতে মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসী পরিবারের অনেক সন্তান বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতো, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তাদের সংখ্যা কমে গেছে। ‘আমরা সরকারকে অনুরোধ করেছি, যেন ওই দেশগুলোতে ভর্তি পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। যাতে সেখান থেকে আরও বেশি শিক্ষার্থী আসতে পারে,’ যোগ করেন তিনি।

আরও পড়ুন