ময়মনসিংহ নগরীতে বেপরোয়া ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্যের কারণে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে। শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী ও অটোরিকশাচালকসহ সবাই এ বিপদের শিকার হচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যে দেখা যাচ্ছে, গত এক মাসে ১ হাজারের বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ব্রহ্মপুত্র নদের চরে ঘুরতে গিয়ে ছিনতাইকারীদের ধাওয়ায় নিখোঁজ হন আনন্দ মোহন কলেজের শিক্ষার্থী নুরুল্লাহ শাওন (২৬)। দুদিন পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল ও পুলিশ সুপারের কার্যালয় ঘেরাও করে খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জেলায় মোট ১১১টি খুনের ঘটনা ঘটেছে, এর মধ্যে ২০টি খুন ছিনতাইকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছে। একই বছরে ছিনতাইয়ের ঘটনায় ৬০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ৪৬৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে বাস্তবে প্রতি মাসে প্রায় এক হাজারের বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। কোতোয়ালি থানায় প্রতিদিন গড়ে ৮-১০টি অভিযোগ জমা পড়ছে, যদিও অনেক ভুক্তভোগী সামাজিক হয়রানি ও পুলিশের প্রতি অনাস্থার কারণে অভিযোগ করতে সাহস পান না।
নগরীর শম্ভুগঞ্জ, ব্রীজ মোড়, কেওটখালী, বাকৃবি শেষ মোড়, সানকিপাড়া, মীরবাড়ি, কলেজ রোড, গাঙ্গিনারপাড়, স্টেশন রোড, পুরোহীতপাড়া, বাঘমারা, চরপাড়া, মাসকান্দা ও জয়নুল আবেদীন পার্ক এলাকাগুলোকে ছিনতাইয়ের ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্তমানে ছিনতাই সংঘটিত হচ্ছে নির্জন স্থান ছাড়াও চলন্ত অটোরিকশা ও জনসমাগমপূর্ণ এলাকায়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত বছর আটক হওয়া ৪৬৭ জনের মধ্যে ৩৬২ জন স্টেশন রোড, পুরোহীতপাড়া, সানকিপাড়া ও মীরবাড়ির বাসিন্দা। আটক হওয়া অন্তত ৩০০ জন পেশাদার ছিনতাইকারী জামিনে বেরিয়ে আবারও অপরাধে জড়িত হয়েছে।
আইনজীবীরা জানিয়েছেন, দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩৭৯, ৩৮৫, ৩৮৬ ও ৩৯২ ধারায় ছিনতাইয়ের মামলা হলেও সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাব ও দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেক আসামি খালাস পেয়ে যায় বা সহজে জামিন পায়। এর ফলে অপরাধ দমনে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না।
সচেতন নাগরিকরা অপরাধপ্রবণ এলাকায় সিভিল পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, সিসিটিভি স্থাপন, মোবাইল আইএমইআই ট্র্যাকিং জোরদার, বিট পুলিশিং সক্রিয়করণ এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠনের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি ছিনতাই করা পণ্য কেনাবেচায় জড়িত অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
নগরীতে ছিনতাইয়ের বৃদ্ধির সত্যতা নিশ্চিত করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেছেন, মানুষকে সতর্কভাবে চলাফেরা করার জন্য সবসময় সচেতন করতে চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়া, ছিনতাইয়ের শিকার হলে থানায় অভিযোগ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। পুলিশ সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে সর্বদা চেষ্টা করে যাচ্ছে।
