মৌলভীবাজারের ৩০০ বছর পুরোনো মন্দির ও অজ্ঞান ঠাকুরের কিংবদন্তি

মৌলভীবাজারের ৩০০ বছর পুরোনো মন্দির ও অজ্ঞান ঠাকুরের কিংবদন্তি

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাউয়া দিঘি হাওর এলাকায় অবস্থিত অজ্ঞান ঠাকুরের মন্দির। তিন শ বছর ধরে তীর্থযাত্রী ও সাধারণ দর্শনার্থীরা রোগমুক্তির আশায় এখানে ছুটে আসেন। সব ধর্মের মানুষই এখানে আসেন মানত করতে এবং সান্ত্বনা খুঁজতে।

যার স্মরণে এই মন্দির তৈরি করা হয়েছিল, তার জীবনকাহিনির সঙ্গেই জড়িয়ে আছে এর ইতিহাস। মন্দিরটি এখনো ভক্তদের ভক্তি-শ্রদ্ধার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে টিকে আছে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় এখানে প্রদীপ জ্বালানো হয়। পৌষসংক্রান্তিতে আয়োজন করা হয় বড় অনুষ্ঠান। হাওরের চারপাশের গ্রামগুলোয় এখনো এই সাধকের কিংবদন্তি মানুষের মুখে মুখে ঘোরে।

গল্পের শুরু ‘কেশব’ নামের এক ছেলেকে ঘিরে। প্রখ্যাত পণ্ডিত অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধির সংকলিত ‘শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’ অনুযায়ী, কেশব মৌলভীবাজারের বুড়িকোনা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলায় তাকে সহজ-সরল বা বোকা প্রকৃতির মনে করা হতো। প্রতিবেশীদের বাড়ি থেকে চাল বা কলা নিয়ে ফেরার পথে রাখাল ছেলেরা সেগুলো কেড়ে নিলেও কেশব কখনো বিচলিত হতেন না।

কিন্তু তার এই সহজ-সরল আচরণের আড়ালে গভীর কোনো অর্থ লুকিয়ে ছিল। এক ঘটনার পর কেশব নিখোঁজ হন। তিনি গ্রামের পাশের গভীর জঙ্গলে চলে যান। যেখানে তখন বাঘ ও বন্য মহিষের ভয় ছিল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর পরিবার ধরে নেয় যে তিনি মারা গেছেন।

কিন্তু তিন দিন পর কেশব ফিরে আসেন সম্পূর্ণ নতুন মানুষ হয়ে। তিনি নিজের খাবার নিজে রান্না করতেন। খুব কম কথা বলতেন এবং ঠাকুরঘরের আশপাশেই সময় কাটাতেন। বয়সে বড় সব পুরুষকে তিনি ‘জ্যাঠা’ এবং নারীদের ‘জেঠি’ বলে ডাকতেন।

একদিন সন্ধ্যায় ওই এলাকা থেকে কয়েকটি গবাদি পশু হারিয়ে যায়। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন রাখালেরা। কেশব তখন নিখুঁতভাবে বলে দেন কার গরু কোথায় পাওয়া যাবে। তার কথা মতো গরুগুলো খুঁজে পেয়ে ছেলেরা অবাক হয়ে যায়। দ্রুতই এই খবর আশপাশের গ্রামগুলোয় ছড়িয়ে পড়ে।

এর পর থেকেই কেশবের দরজায় মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। অসুস্থ ও কষ্টে থাকা মানুষেরা তার কাছে সাহায্য চাইতে আসতে শুরু করেন। অনেকেই বিশ্বাস করতেন, কেশবের স্পর্শ বা সান্নিধ্যেই সব দুঃখ-কষ্ট দূর হয়ে যায়।

বিনন্দরাম ধর নামের এক গ্রামবাসীর একটি ঘটনা কেশবের খ্যাতি আরও বাড়িয়ে দেয়। একদিন বিনন্দরামকে দেখে কেশব হঠাৎ বলেন, ‘জ্যাঠা, তোমার গাছের আম তো পেকে গেছে, আমাকে এনে দাওনি কেন?’ তখন আমের মৌসুম ছিল না। কিন্তু অবাক হয়ে বিনন্দরাম বাড়ি ফিরে দেখেন, সত্যিই তার গাছে পাকা আম ঝুলছে!

এ রকম সময়ে কুতুব শাহ নামের একজন পীর ওই এলাকায় আসেন। এই পরিব্রাজক পীর ও গ্রাম্য সাধকের সাক্ষাৎ হয়। কথিত আছে, আধ্যাত্মিক ঘোরের মধ্যে থাকা কেশব একদিন পীরের সামনে গিয়ে মাটিতে ফেলা তার থুতু তুলে নেন। এতে পীর রাগ না করে তাকে ভালোবেসে ‘অজ্ঞান’ বলে ডাকেন। ‘অজ্ঞান’ শব্দের সাধারণ অর্থ ‘মূর্খ’ হলেও, এখানে শব্দটি এমন কাউকে বোঝায় যার জ্ঞান পুঁথিগত শিক্ষার ঊর্ধ্বে। তখন থেকেই কেশব ‘অজ্ঞান ঠাকুর’ নামে পরিচিতি পান।

অজ্ঞান ঠাকুরকে ঘিরে প্রচলিত অনেক গল্পের মধ্যে তার নৌকা নিয়ে কিংবদন্তিটি সবচেয়ে বিখ্যাত। বলা হয়, তিনি ‘বনমালী’ নামের একটি নৌকা তৈরি করেন। বিস্ময়করভাবে নৌকাটি কোনো পানি দিয়ে নয়, বরং প্রায় চার মাইল শুকনো মাটি পেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছায়।

আরেকটি কিংবদন্তি হলো—রাতের বেলা হাওর থেকে ভেসে আসা এক বাদ্যের শব্দ। বিরিমাবাদ গ্রামের বেশ কয়েকজন বাসিন্দা জানান, তারা রাতের বেলা হাওর থেকে ঢোল ও করতাল বাজানোর শব্দ শুনেছেন। ভক্তদের বিশ্বাস, জীবিত থাকতে হাওরে যেভাবে নৌকায় ঘুরে বেড়াতেন, অজ্ঞান ঠাকুর ও তার সঙ্গীরা এখনো সেভাবেই ঘুরে বেড়ান। ভাগ্যবান কেউ কেউ নাকি এখনো সেই বাদ্যের শব্দ শুনতে পান।

জীবনের শেষ দিকে অজ্ঞান ঠাকুর সন্ন্যাস জীবন যাপন করতে শুরু করেন। তিনি মন্দিরে থেকে যান এবং সব সময় জপ ও ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। এরপর একদিন সকালে তিনি আর মন্দির থেকে বের হলেন না। এভাবে এক সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ার পর গ্রামবাসী মন্দিরের দরজা ভেঙে ফেলেন। কিন্তু ভেতরে অজ্ঞান ঠাকুরের কোনো চিহ্নই পাওয়া গেল না, কেবল মাটিতে একটি বড় গর্ত দেখতে পেলেন তারা। অনেকের বিশ্বাস, তিনি স্বাভাবিকভাবে মারা যাননি, বরং এই গর্ত দিয়েই তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। গর্তটি পরে পাথর দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

অজ্ঞান ঠাকুরের মন্দিরের অবস্থান কাউয়া দিঘি হাওরের ধারে একাতুনা ইউনিয়নের বিরিমাবাদ গ্রামে। তিন শতাব্দী পেরিয়ে মন্দিরটি এখনো উপাসনা এবং মানুষের মিলনকেন্দ্র হিসেবে টিকে আছে। হিন্দু, মুসলিমসহ সব ধর্মের মানুষেরা এখানে আসেন মানত করতে। একসময় এখানে কয়েক দিন ধরে ‘বারুণী’ নামের একটি মেলা বসত। এখন মেলাটি তার জৌলুশ হারালেও মন্দিরটি ঘিরে মানুষের জমায়েতের রেওয়াজ এখনো টিকে আছে।

শ্রী শ্রী অজ্ঞান ঠাকুর মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বাবুল সূত্রধর বলেন, মন্দিরে ভক্তের সংখ্যা বাড়ছে। সিলেট অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এই মন্দিরের এক আলাদা জায়গা রয়েছে। এটি একই সঙ্গে হিন্দু মন্দির, পীর কুতুব শাহের স্মৃতিবিজড়িত স্থান এবং সব ধর্মের মানুষের মিলনমেলা।

আরও পড়ুন