রাঙামাটিতে ভয়াবহ পাহাড়ধসের ৯ বছর পূর্ণ হয়েছে আজ। ২০১৭ সালের ১৩ জুন টানা তিন দিনের ভারি বর্ষণের পর জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসে প্রাণ হারান ১২০ জন, যাদের মধ্যে ৫ জন সেনাসদস্যও ছিলেন। এ ঘটনায় দেড় হাজারের বেশি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে জনজীবন। তবে, সেই মর্মান্তিক ঘটনার ৯ বছর পরও ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদ ও নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
পাহাড়ধসের এক বছর পর ২০১৮ সালের ১২ জুন রাঙামাটির নানিয়াচর উপজেলায় আরেকটি পাহাড়ধসে প্রাণ হারান আরও ১১ জন। ফলে, এক বছরের ব্যবধানে পাহাড়ধসে প্রাণহানির সংখ্যা ১৩১ জনে পৌঁছায়। এত বড় মানবিক বিপর্যয়ের পরও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস ও নতুন স্থাপনা তৈরি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে জেলার ১০টি উপজেলায় লক্ষাধিক মানুষ পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে বসবাস করছেন। রাঙামাটির পৌর এলাকায় অন্তত ১৪৫টি পাহাড় এবং ২৯টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানের পাদদেশে প্রায় ২০ হাজার মানুষের বসবাস রয়েছে। বর্ষা মৌসুম এলেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং, সতর্কতা ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ত্যাগের আহ্বান জানানো হলেও স্থায়ী পুনর্বাসনের অভাবে অনেকেই আবারও সেইসব এলাকায় ফিরে যান।
২০১৭ সালের পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবার এখনও ঝুঁকিপূর্ণভাবে একই জায়গায় বসবাস করছে। তাদের অভিযোগ, নিরাপদ আবাসনের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে তারা পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছেন। বর্ষা মৌসুম এলেই তাদের মধ্যে আতঙ্ক ফিরে আসে।
রূপনগর এলাকার বাসিন্দা মো. নুর ইসলাম বলেন, “২০১৭ সালের পাহাড়ধসে আমার এক ভাগনি, এক ভাতিজি ও একজন প্রতিবেশী মারা যান। তাদের মরদেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি। আমাদের বারবার পুনর্বাসনের আশ্বাস দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। আমরা জীবন বিপন্ন করে এখানে বসবাস করতে চাই না।”
রাঙামাটি জেলার রোভার স্কাউটের কমিশনার নুরুল আবছার বলেন, “পাহাড়ধসের পর গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশগুলো এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নতুন বসতি স্থাপন বন্ধ ও পাহাড় ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।”
জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, “পাহাড়ধসের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রশাসন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বর্ষা মৌসুমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সরিয়ে নিতে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।”
২০১৭ সালের পাহাড়ধসে পর গঠিত সরকারি তদন্ত কমিটি পাহাড় ব্যবস্থাপনা, অবৈধ পাহাড়কাটা বন্ধ, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি অপসারণ, বৃক্ষরোপণ, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ ও পূর্ণবাসন কার্যক্রম জোরদারের সুপারিশ করেছিল। তবে, দীর্ঘ ৯ বছরেও অধিকাংশ সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু বর্ষা মৌসুমে সতর্কতামূলক কার্যক্রম চালানো যথেষ্ট নয়। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ পুনর্বাসন এবং পাহাড় সংরক্ষণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
