ক্যানসার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর পদ্ধতি। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে এটি রোগ নিয়ন্ত্রণে, অনেক ক্ষেত্রে রোগ সারাতে, আবার অনেক ক্ষেত্রে ব্যথা, রক্তক্ষরণ বা শ্বাসকষ্ট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু আমাদের দেশে এখনো রেডিওথেরাপি নিয়ে মানুষের মধ্যে অনেক ভয়, ভুল ধারণা ও কুসংস্কার আছে। ফলে অনেকে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসা নিতে দেরি করেন বা অযথা আতঙ্কে ভোগেন।
বাস্তবে রেডিওথেরাপির কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে, তবে সেগুলোর বেশিরভাগই সাময়িক, নিয়ন্ত্রণযোগ্য এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে সহনীয় পর্যায় থাকে।
বাংলাদেশে রোগীরা সাধারণত কয়েকটি বিষয় নিয়ে বেশি ভয় পান। যেমন: শরীর পুড়ে যাবে, সব চুল পড়ে যাবে, শরীর একেবারে দুর্বল হয়ে যাবে, চিকিৎসা নিতে নিতে মানুষ শেষ হয়ে যায়, রেডিওথেরাপি মানেই খুব কষ্টকর চিকিৎসা। এই ভয়গুলো কিছু কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে এলেও, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এগুলো অতিরঞ্জিত বা ভুলভাবে ছড়ানো ধারণা। আধুনিক রেডিওথেরাপি আগের তুলনায় অনেক বেশি নিখুঁত ও নিরাপদ।
সব রোগীর একই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় না। এটি নির্ভর করে শরীরের কোন অংশে রেডিওথেরাপি দেওয়া হচ্ছে তার উপর। তবে কিছু সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো: ক্লান্তি, ত্বকের পরিবর্তন, খাওয়ায় সমস্যা, বমিভাব বা পাতলা পায়খানা এবং চুল পড়া। বেশিরভাগ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াই চিকিৎসা চলাকালীন বা কিছুদিন পরে দেখা দেয় এবং ধীরে ধীরে কমে যায়।
সমাজে প্রচলিত কুসংস্কারের মধ্যে রয়েছে: রেডিওথেরাপি পাচ্ছে এমন রোগীদের সাথে থাকা বা খাওয়া দাওয়া করা যায় না, রেডিয়েশন থেরাপি দিলে পুরো শরীর রেডিয়েশন হয়ে যায়, চিকিৎসার সময় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে বুঝতে হবে চিকিৎসা ভুল হচ্ছে, একবার রেডিওথেরাপি শুরু করলে আর বাঁচার আশা থাকে না। এসবের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সামলাতে চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ নিয়মিত খেতে হবে, পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে, পুষ্টিকর ও নরম খাবার খেতে হবে, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে, ধূমপান ও তামাক বন্ধ করতে হবে, চিকিৎসা দেওয়া জায়গায় ঘষাঘষি বা গরম সেঁক দেওয়া যাবে না, নিজের ইচ্ছামতো কোনো ক্রিম, তেল বা হারবাল কিছু ব্যবহার করা ঠিক নয় এবং মুখে রেডিওথেরাপি হলে মুখ ও দাঁতের যত্ন খুব জরুরি।
দ্রুত চিকিৎসককে জানাতে হবে যদি খুব বেশি জ্বর, শ্বাসকষ্ট, গিলতে না পারা, বারবার বমি, তীব্র ডায়রিয়া, অসহনীয় ব্যথা বা ত্বকে গুরুতর ক্ষত দেখা দেয়। রেডিওথেরাপি নিয়ে ভয় পাওয়ার চেয়ে সঠিক তথ্য জানা বেশি জরুরি। এটি ক্যান্সারের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে, কিন্তু সেগুলোর অধিকাংশই সাময়িক এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য। তাই কুসংস্কার, গুজব বা ভয় নয়, চিকিৎসকের পরামর্শের উপর আস্থা রাখা উচিত।
