বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ সংশোধিত আকারে সংসদে পাশের সুপারিশ করেছে। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, অধ্যাদেশটি কিছু সংশোধনীসহ পাশের সুপারিশ করা হয়েছে। তিনি এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করেননি। বিশ্লেষকদের মতে, কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী অধ্যাদেশটি সংসদে আইন আকারে পাশ হলে আওয়ামী লীগের যেকোনো কার্যক্রম শুধু নিষিদ্ধই নয়, বরং দলটির সব নেতাকর্মীদেরও বিচারের আওতায় আনা যাবে।
২০২৫ সালের ১২ই মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সব সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রজ্ঞাপনে কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হলেও নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের জন্য কোনো শাস্তির ব্যবস্থা ছিল না।
সংসদের বিশেষ কমিটির একটি সূত্র বলছে, কমিটিতে সরকারের পক্ষ থেকে মতামত এসেছিল যে কার্যক্রম-নিষিদ্ধ সত্তা নিষেধ অমান্য করলে কী শাস্তি হবে তার উল্লেখ নেই। সংশোধিত আকারে সংসদে পাশ করা যেতে পারে। সরকারের সূত্রগুলো বলছে, সন্ত্রাস বিরোধী আইনে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের জন্য যেসব সাজার ব্যবস্থা রয়েছে সেটিই আওয়ামী লীগের জন্য প্রযোজ্য হতে যাচ্ছে।
আওয়ামী লীগের মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী আরাফাত দলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় এক বিবৃতিতে বলেছেন, বিএনপিকে দেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার পূর্ণ দায় নিতে হবে এবং ভবিষ্যতে এর ফলে যে পরিণতি হবে, তা বিএনপিকেই ভোগ করতে হবে।
বিএনপি ও সরকারের একটি সূত্র অবশ্য বলছে, আইনটি পরে সংশোধনের সুযোগ থাকবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিএনপি বলেছিল নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নয় তারা। এ বিষয়ে জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আইন করে একটি দলকে নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে অপরাধ থাকলে আদালতে বিচার কিংবা ভোটের মাধ্যমে জনগণকে দলটিকে প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ দিলে এ নিয়ে প্রতিহিংসার অভিযোগ ওঠার সুযোগ থাকতো না। তাদের মতে, সরকার ও সমমনা দলগুলো এখনো আওয়ামী লীগকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারেন কিন্তু দল নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্যতা পাবার ইতিহাস রাজনৈতিক অঙ্গনে নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, আওয়ামী লীগ একাত্তরেও নিষিদ্ধ হয়েছিল। এখন মামলা হলে আদালত রায় দিত। কিন্তু সরকার সে পথেও যাচ্ছে না। জনগণ ভোট না দিলে দলটি ব্রাত্য হয়ে পড়তো। কিন্তু সরকার ও সমমনা দলগুলো এখনো আওয়ামী লীগকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে নিষিদ্ধ করে রাখতে চাইছে বলেই এটিকে প্রতিহিংসা মনে হতে পারে।
আরেকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জোবাইদা নাসরীন বলছেন, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা ঐতিহাসিকভাবেই কখনো কারও জন্য সুফল বয়ে আনেনি, বরং যারা করেছে তাদের ঐতিহাসিক দায় নিতে হয়েছে। তিনি বলেন, কোনো অর্থেই রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম বন্ধ করা বা দল নিষিদ্ধ করা কাউকে সাময়িক তৃপ্তি কিংবা প্রতিহিংসা মেটানোর স্বাদ দিতে পারে কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে দেশ ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এটি মোটেও ভালো পদক্ষেপ নয়।
