সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে তার চাচাতো ভাইয়ের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এ তথ্য নিশ্চিত করে।
গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি ধানমন্ডির ৮/এ সড়কের ওই বাসায় পৌঁছান। বাসাটির মালিক তার চাচাতো ভাই আরিফ মাসুদ চৌধুরী। আরিফ জানান, সোমবার শিরীন শারমিন ফোন করে বাসায় আসার কথা বলেছিলেন এবং তার পছন্দের খাবার রাখতে অনুরোধ করেছিলেন।
আরিফ বলেন, ‘সোমবার সন্ধ্যায় তিনি ও তার স্বামী ছোট একটি লাগেজ নিয়ে বাসায় আসেন। আমরা একসঙ্গে রাতের খাবার খেয়েছি।’ মাঝরাতের দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বাসায় আসতে শুরু করেন এবং ইন্টারকমের মাধ্যমে যোগাযোগ করে তল্লাশি চালানোর অনুমতি চান।
আরিফ আরও বলেন, ‘আমি শিরীনকেও বিষয়টি জানাই। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অ্যাপার্টমেন্টে এসে তাকে ‘স্যার’ সম্বোধন করে জানান, তাদের নির্দেশে তাকে নিয়ে যেতে হবে। এরপর তিনি তাদের সঙ্গে যান।’
গ্রেপ্তারের পর শিরীন শারমিনকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। পরে তাকে লালবাগ থানায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। মামলাটি ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই পুরান ঢাকার লালবাগ এলাকায় মোহাম্মদ আশরাফুল নামের একজনকে গুলির ঘটনায় করা হয়েছে।
মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার দিকে শিরীন শারমিনকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নেওয়া হয়। তিনি সাদা একটি মাইক্রোবাসে আদালত প্রাঙ্গণে পৌঁছান। তাকে আদালতের হাজতখানায় প্রায় ৭৫ মিনিট রাখার পর বিকেল ৩টার দিকে কাঠগড়ায় হাজির করা হয়।
আদালতে তদন্ত কর্মকর্তা জানান, শিরীন শারমিনকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১২৯ জনকে আসামি করা হয়েছিল। শুনানির সময় তদন্ত কর্মকর্তা ভুল করে শিরীনের বাবার নামের সময় স্বামীর নাম বলেন, যা সাবেক স্পিকার নিজেই সংশোধন করে দেন।
ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী শিরীন শারমিনকে ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী’ হিসেবে উল্লেখ করে তার রিমান্ড চান। তিনি বলেন, ‘তিনি ওই সরকারের সুবিধাভোগী ছিলেন।’
আসামিপক্ষের আইনজীবী আবুল হাসানাত ইমরুল কায়সার রিমান্ড আবেদনের বিরোধিতা করেন। তিনি আদালতকে বলেন, ‘আমার মক্কেলই একমাত্র ব্যক্তি যিনি পদত্যাগ করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আসামি কি ভুক্তভোগীকে গুলি করেছেন? তিনি অবস্থান ছিল নিরপেক্ষ।’
আইনজীবীরা শিরীন শারমিনের অসুস্থতার কথাও উল্লেখ করেন। হাসানাত বলেন, ‘তিনি খুব অসুস্থ। দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।’ শুনানির সময় সাবেক স্পিকার বেশিরভাগ সময় চুপ ছিলেন এবং সাংবাদিকদের নোটের দিকে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছিলেন।
উভয়পক্ষের বক্তব্য শোনার পর ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানা ডিবির দুই দিনের রিমান্ড আবেদন এবং আসামিপক্ষের জামিন আবেদন—দুটিই নামঞ্জুর করে শিরীন শারমিনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। আদেশের পর সাবেক স্পিকারকে মৃদু হাসতে দেখা যায়।
বিকেল ৩টা ৩৫ মিনিটের দিকে আদালতের ভেতরে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়। শিরীন শারমিনকে হাজতখানায় নিয়ে যাওয়ার সময় হুড়োহুড়ির মধ্যে তিনি আদালতের সিঁড়িতে পড়ে যান এবং ভয় পেয়ে চিৎকার করে ওঠেন। নারী পুলিশ সদস্যরা তাকে ঘিরে রাখেন।
এদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীদের একটি অংশ আদালত প্রাঙ্গণে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন। বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয়।
শিরীন শারমিন চৌধুরী ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হন। টানা তিন মেয়াদে তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই জনসমক্ষে তার দেখা যায়নি।
২০২৫ সালের মে মাসে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) গণঅভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন সেনানিবাসে আশ্রয় নেওয়া ৬২৬ জনের একটি তালিকা প্রকাশ করে। ওই তালিকার চার নম্বরে সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর নাম ছিল।
