বিগত শাসনামলের স্বৈরশাসন, জবাবদিহিতাহীন সমাজ ব্যবস্থা ও স্বেচ্ছাচারিতা বাহাত্তরের সংবিধানের দোষ নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক। তিনি বলেন, পূর্ববর্তী ক্ষমতাসীনেরা বাহাত্তরের সংবিধানকে বারবার অপব্যবহার করেছেন।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ৩০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ‘মুক্তিযুদ্ধ ও বাহাত্তরের সংবিধান’ শীর্ষক স্মারক বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। শাহদীন মালিক বলেন, বাহাত্তরের সংবিধান তৈরির সময় এ নিয়ে বিস্তর আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক হয়েছে।
তিনি বলেন, এটি আমাদের সংবিধানের মূল শক্তি। সংবিধান প্রণয়নকারীরা প্রত্যেকেই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হওয়া সত্ত্বেও সংবিধান প্রণয়ন শেষে পদত্যাগ করে নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছিলেন। যা সারাবিশ্বেই বিরলতম উদাহরণগুলোর একটি।
শাহদীন মালিক বলেন, আমার কাছে আজও বিস্ময় লাগে তারা কি দুরবস্থার মধ্যেই না আমাদের সংবিধান প্রণয়ন করেছেন। বাহাত্তর সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে কোনো ব্রিজ নেই, এক কোটি শরণার্থী তখন ভারত থেকে দেশে ফিরে আসছেন।
দেশে কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নেই। এতকিছুর মধ্যেও তারা দিনের পর দিন আলোচনার মাধ্যমে, যুক্তি-তর্ক-বিতর্ক ও মতামত উপস্থাপনের মাধ্যমে সংবিধান রচনা করেছেন। সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে তারা কোনো তাড়াহুড়া করেননি।
তিনি বলেন, এক বছরব্যাপী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে এ সংবিধান রচিত হয়েছিল। কোনো কিছুই নির্ভুল হয় না। বাহাত্তরের সংবিধানও নির্ভুল ছিল না। সেটি থাকা স্বাভাবিক।
কিন্তু গত কয়েক বছরের স্বৈরশাসন, জবাবদিতিতাহীন সমাজ ব্যবস্থা ও স্বেচ্ছাচারিতা বাহাত্তরের সংবিধানের দোষ নয়। পূর্ববর্তী ক্ষমতাসীনেরা বাহাত্তরের সংবিধানকে বারবার অপব্যবহার করেছেন। সংবিধানে ১৬-১৭টি সংশোধনী আনা হয়েছে।
দেশে আইনের শাসন না থাকার জন্য আইন দায়ী নয়, বরং যারা আইন প্রয়োগ করে তাদের অপপ্রয়োগই মূলত দায়ী। এই আইনজীবী বলেন, বাহাত্তরের সংবিধানের মূলমন্ত্র ছিল প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। উৎস নয়।
সংবিধানে প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা সীমিত রাখার মাধ্যমেই জনগণের অধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এখন আমি যখন সংবিধান পড়ি তখন ভাবি, তখন তো কোথাও ইন্টারনেট ছিল না। সার্চ ইঞ্জিন ছিল না।
মাসের পর মাস তারা বিভিন্ন দেশের সংবিধান থেকে প্রাপ্ত প্রকৃষ্ট বিষয়গুলো জীবনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সংবিধানে তুলে এনেছেন। তারপরও এ নিয়ে বিস্তর তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফাকে মুক্তির প্রথম সনদ ও ‘প্রথম খসড়া সংবিধান’ বলে আখ্যায়িত করেন শাহদীন মালিক।
তিনি আরও বলেন, সাতচল্লিশে ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর পাকিস্তান যে প্রশাসনিক কাঠামো বজায় রেখেছিল, তা ছিল মূলত সম্পদ লুণ্ঠনের একটি যন্ত্র। এই কাঠামোর বিরুদ্ধে বাঙালিদের প্রথম প্রতিবাদ ছিল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন।
১৯৬৬ সালের ছয় দফা ছিল আমাদের মুক্তির প্রথম সনদ বা প্রথম খসড়া সংবিধান। স্মারক বক্তৃতায় জুলাই অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ছিল দীর্ঘদিন ধরে জনগণের অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
স্বৈরশাসকের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি এমনই হয়। বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি বলেন, ইতিহাস হলো বর্তমান ও অতীতের মধ্যে এক চলমান আলোচনা। ইতিহাস একটা বিতর্কের বড় জায়গা। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে সময়ের সঙ্গে ইতিহাসের বিকৃতি যেন না ঘটে।
