রাতের আঁধারে চোখ বেঁধে হত্যা করা হয় কারমাইকেল কলেজের ৪ শিক্ষককে

রাতের আঁধারে চোখ বেঁধে হত্যা করা হয় কারমাইকেল কলেজের ৪ শিক্ষককে

১৯৭১ সালের ৩০ এপ্রিল রাত আনুমানিক ১০টায় রংপুরের কারমাইকেল কলেজের শিক্ষক কোয়ার্টারে হঠাৎ সামরিক ট্রাকের শব্দে নিস্তব্ধতা ভেঙে যায়। পাকিস্তানি সেনারা আল-বদর বাহিনীর সহায়তায় কোয়ার্টার থেকে চার হিন্দু ধর্মাবলম্বী শিক্ষককে চিহ্নিত করে আটক করে। তারা হলেন গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন রায়, দর্শন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুনীল বরণ চক্রবর্তী, বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রামকৃষ্ণ অধিকারী ও রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কালাচাঁদ রায়।

পাকিস্তানি সেনারা শিক্ষকদের রাইফেলের বাট দিয়ে পিটুনি দিয়ে ট্রাকে তোলে। কালাচাঁদ রায়ের স্ত্রী মঞ্জুশ্রী রায় বাঁচাতে এগিয়ে এলে তাকেও লাথি মেরে ট্রাকে তোলা হয়। পরে ট্রাকটি রংপুর-বগুড়া মহাসড়ক ধরে দমদমা ব্রিজের কাছে থামে। সেখানে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় চার শিক্ষক ও মঞ্জুশ্রী রায়কে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। স্থানীয়রা পরে তাদের গণকবর দেন।

প্রত্যক্ষদর্শী শোভা কর আদালতে সাক্ষ্য দেন যে, তিনি ও তার ভাইয়ের স্ত্রী কানন বালা পড়াশোনা করছিলেন। প্রতিবেশী অধ্যাপক আব্দুল জলিলের বাড়িতে আল-বদর সদস্যরা দরজায় কড়া নাড়ে। শুকুর মিয়া দরজা খুলে দিলে সশস্ত্র পাকিস্তানি সেনারা ভেতরে প্রবেশ করে। পরে তারা বাঁশের বেড়া পেরিয়ে চিত্তরঞ্জন রায়ের বাড়িতে ঢুকে তাকে আটক করে। তার চোখ ও হাত পেছন থেকে বেঁধে ফেলে। এক সেনা শোভা করের কানের দুল ছিনিয়ে নেয়।

শহীদ রামকৃষ্ণ অধিকারীর বন্ধু অধ্যাপক রেজাউল হক দৈনিক বাংলার প্রতিবেদনে জানান, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রামকৃষ্ণ বলেছিলেন, ‘আবার গোলযোগ হলে আমাদের পালানোর জায়গা আছে। ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেবো, বেঁচে যাবো। ভাই আপনারা যাবেন কোথায়? আপনাদের যে আর কোনো পথ রইল না।’ ১৯৭২ সালের ১৯ জানুয়ারি দৈনিক বাংলায় ‘রংপুর জেলাটাই যেন বধ্যভূমি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই কথোপকথন উঠে আসে।

শুধু এই চার শিক্ষকই নন, একাত্তরের ২ জুন রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক আব্দুর রহমান ও ৭ জুন উর্দু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহ মোহাম্মদ সোলায়মানকেও দমদমা ব্রিজের কাছে হত্যা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের ৩০ এপ্রিলের এই হত্যাকাণ্ডের জন্য ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জামায়াতে ইসলামী নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তিনি রংপুর কারমাইকেল কলেজের ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি ছিলেন। তবে ২০২৫ সালের ৮ মে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে তিনি বেকসুর খালাস পেয়ে কারামুক্ত হন।

আরও পড়ুন