আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও কেন এখনো উদ্বেগ?

আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও কেন এখনো উদ্বেগ?

পুলিশ বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে এবং উন্নতি হয়েছে। তবে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মব সহিংসতার ঘটনা এখনো থামছে না। পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এ এইচ এম শাহাদত হোসাইন বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘আগের চেয়ে অনেক ইমপ্রুভ করেছে। গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার হয়েছে। সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজদের তালিকা করে অভিযান চলছে। অনেককে আটক করা হয়েছে। সব মিলিয়ে কিছু অপরাধ থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেই আছে, অবনতি হয়নি।’

শুক্রবার পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেন, পুলিশের কিছু বিশৃঙ্খলা অনেকাংশে সুশৃঙ্খল করা সম্ভব হয়েছে। তবে পুলিশের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, কথিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তৎপরতা, পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র এবং চাঁদাবাজিতে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্তদের জড়িত হওয়া আইনশৃঙ্খলা অবনতির বড় কারণ।

এপ্রিল মাসে মব সহিংসতায় অন্তত ১৯ জন প্রাণ হারিয়েছে বলে জানিয়েছে একটি মানবাধিকার সংস্থা। রোববার থেকে শুরু হয়েছে চার দিনের পুলিশ সপ্তাহ। এ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় পুলিশের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি অপরিহার্য।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘সরকারের আড়াই মাসেই পুলিশ বাহিনী সক্রিয় ও কার্যকর হয়ে উঠেছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। একই সাথে জনমনেও আস্থা ফিরে এসেছে। সে কারণেই সেনাবাহিনীকে মাঠ পর্যায় থেকে পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করা হচ্ছে।’

পুলিশ বলছে, গত চব্বিশ ঘণ্টায় ঢাকায় ১০০ জনের বেশি এবং চলতি মাসের প্রথম সাত দিনে ৯০০ জনের বেশি ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। তবে ছিনতাই ও চাঁদাবাজির অভিযোগ আসছেই। ঢাকার কাওরানবাজারসহ কয়েকটি এলাকায় প্রকাশ্য ছিনতাইয়ের ঘটনা আলোচনায় এসেছে।

বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের মাসিক পর্যালোচনা সভায় চাঁদাবাজির সাথে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার প্রসঙ্গ তোলেন পুলিশ কর্মকর্তারা। জবাবে ডিএমপি কমিশনার মো. সরওয়ার চাঁদাবাজদের গ্রেফতারে রাজনৈতিক পরিচয় না দেখার নির্দেশ দেন। ঢাকার একটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘সরকারি দলের লোকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসলে অনেক সময় ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। সে কারণেই প্রসঙ্গটি উঠেছিল।’

২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পুলিশ বাহিনীতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদের সব এখনো উদ্ধার হয়নি। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল পর্যন্ত এক হাজারের বেশি অস্ত্র ও প্রায় আড়াই লাখ গোলাবারুদ উদ্ধার হয়নি। এসব অস্ত্র পেশাদার সন্ত্রাসীদের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ৩০ এপ্রিল জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠন করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে, যার সভাপতি প্রধানমন্ত্রী। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী আগামী দুই মাসের মধ্যে লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারের নির্দেশ দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, লুট হওয়া অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে গেছে এবং কিছু ঘটনায় সেগুলো ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।

পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে ঢাকায় কয়েকটি নতুন থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুলিশের মুখপাত্র শাহাদত হোসাইন বলেন, ‘একদিকে পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানো এবং অন্যদিকে গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। এগুলো পরিস্থিতি আরও ভালো করবে।’

তবে চাঁদাবাজির খবর আসছেই। ঢাকার বাইরেও কয়েকটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামি থানায় গুলিতে এক ব্যক্তি নিহত ও এক শিশু গুলিবিদ্ধ হয়েছে। খুলনার বটিয়াঘাটায় আজিজুল ইসলাম নামের এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গত ৪ মে রাতে গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকা এক ব্যক্তিকে গুলি করার পর তাকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স লক্ষ্য করেও গুলি চালানো হয়।

সম্প্রতি ঢাকায় পুলিশের ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন খুন হওয়ার পর তালিকায় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পুলিশ সূত্র বলছে, এসব সন্ত্রাসীদের অনুসারীরা ঢাকায় ব্যাপক চাঁদাবাজিতে যুক্ত।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান ও পুলিশ সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ওমর ফারুক বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশ বাহিনী পুনর্গঠন ও জন আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি বলেই পুলিশ তাদের সক্ষমতা পুরোপুরি ফিরে পায়নি। এ কারণেই অপরাধ বাড়ছে ও অপরাধীরা বেশি তৎপর হতে পেরেছে। তারা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রভাবশালীদের আনুকূল্য পাচ্ছে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অবশ্য বলেছেন, ‘পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়া পুলিশী বাহিনী সক্রিয় ও কার্যকর হয়ে উঠেছে। তারা আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখছে এবং মানুষের মধ্যেও পুলিশকে নিয়ে আস্থা ফিরে এসেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশ যথাযথ সক্ষমতা অর্জন করে কাজ করছে। সে কারণে সেনাবাহিনী মাঠ থেকে পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার হচ্ছে। পুলিশের সদস্য সংখ্যা বাড়ানোরও প্রক্রিয়া চলছে।’

আরও পড়ুন