পুলিশ কর্মকর্তার রাজনৈতিক বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক, পরিবর্তন কি কেবল পোশাকেই সীমাবদ্ধ?

পুলিশ কর্মকর্তার রাজনৈতিক বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক, পরিবর্তন কি কেবল পোশাকেই সীমাবদ্ধ?

পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) রেজাউল করিম মল্লিকের রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ও বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। চাকরিতে কর্মরত অবস্থায় সরকারি একজন কর্মকর্তা নিজের রাজনৈতিক আদর্শ তুলে ধরে এ ধরনের বক্তব্য দিতে পারেন কি-না, সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। একইসঙ্গে, পুলিশ বাহিনী আবারও দলীয়করণের দিকে ঝুঁকছে কি-না, সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।

ডিআইজি মল্লিক সোমবার তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, প্রায় ২৯ বছরের চাকরি জীবনে তিনি বারবার পদবঞ্চনা, বৈষম্য, অপমান ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তিনি দাবি করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন এবং জাতীয়তাবাদী আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। তিনি প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ ও ‘আপসহীন দেশনেত্রী’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘এ ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য আমরা দিতে দেখতাম ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে। গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন ঘটার পর ওই সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আসবে বলে আমরা আশা করেছিলাম। কিন্তু নতুন রাজনৈতিক সরকারের সময় আবারও একই ঘটনা ঘটার বিষয়টা অত্যন্ত হতাশাজনক ও দুঃখজনক ব্যাপার এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী।’

সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান বলেন, ‘এটা বাহিনীর অন্য সদস্যদের এক ধরনের ভুল বার্তা দিচ্ছে। এটা পুলিশকে নিরপেক্ষ বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার যে প্রচেষ্টার কথা সরকার বলছে, সেই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে।’

পুলিশ সদর দফতর বলছে, ডিআইজি মল্লিকের রাজনৈতিক বক্তব্যের বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে এবং সেটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে কোন ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনও কিছু জানানো হয়নি।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুলিশের দলীয়করণের ঘটনায় সাধারণ মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, যার বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে পাঁচই আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে। হাসিনা সরকারের পতনের পর পুলিশসহ প্রশাসনকে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার দাবি ওঠে এবং সংস্কার কমিশন পুলিশ বাহিনীর ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধে স্বতন্ত্র পুলিশ কমিশন গঠনের সুপারিশ করে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘পোশাক পরিবর্তনের মতো তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ আগে বাস্তবায়ন করা হয়েছে, বাকিগুলোর বিষয়ে তেমন উৎসাহ দেখা যাচ্ছে না। ফলে পুলিশের সদস্যরা আবারও আগের মতো ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, মামলা বাণিজ্যসহ অন্যান্য অপকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত রোববার রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে ঘোষণা দেন, পুলিশ বাহিনী কোনো দলের হয়ে কাজ করবে না এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে। কিন্তু তার এই ঘোষণার তিন দিনের মাথায় ডিআইজি মল্লিক তার সামনে রাজনৈতিক বক্তব্য দেন। বিশ্লেষকরা এ ঘটনাকে ‘অশনি সংকেত’ হিসেবে দেখছেন।

আরও পড়ুন