এক বৃষ্টিভেজা সকালে মাসুদা তার ছোট ভাই মিরওয়াইসের কবর জিয়ারত করতে আফগানিস্তানের উত্তর-পশ্চিম কাবুলের একটি পাহাড়ি কবরস্থানে যান। তবে তিনি এখন পর্যন্ত জানেন না তাকে ঠিক কোথায় দাফন করা হয়েছে। দুই মাস আগে পাকিস্তানি বাহিনীর বিমান হামলায় নিহত হয় মাসুদার ভাই।
২০২৬ সালের মার্চে কাবুলের ওমিদ মাদক পুনর্বাসন হাসপাতালে পাকিস্তানি বিমান হামলায় অন্তত ২৬৯ জন নিহত হন। নিহতদের দেশটির পাহাড়ি কবরস্থানে গণহারে দাফন করা হয়। বিবিসি বলছে, কবরে ঠিক কতজন আছেন তা বলা অসম্ভব। ২৪ বছর বয়সী মিরওয়াইসের মতো অনেকের দেহই শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব ছিল। পাকিস্তানি হামলায় অনেকের শরীর ছিন্নভিন্ন বা এমনভাবে পুড়ে যায় যে তাদের শনাক্ত করা যায়নি।
“আমার ভাইয়ের শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। ওর শরীরের প্রায় কিছুই অবশিষ্ট ছিল না,” কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন ২৭ বছর বয়সী মাসুদা। ওমিদ মাদক পুনর্বাসন হাসপাতালে পাকিস্তানের ওই হামলা আফগানিস্তানের ইতিহাসে সম্ভবত সর্বকালের সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা।
মঙ্গলবার জাতিসংঘের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই হামলায় নিহত ২৬৯ জনকে শনাক্ত করা গেছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও স্বীকার করা হয়েছে রিপোর্টে। পাকিস্তানি বাহিনীর এই হামলাকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে তদন্ত করার দাবি উঠেছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার পরিমাণ বেশ বেড়েছে। এতে নিহতের সংখ্যা কয়েক শ’ ছাড়িয়েছে। বেশিরভাগ হতাহতই পাকিস্তানের বিমান হামলায় হয়েছে। ইসলামাবাদ অভিযোগ করে আসছে, তালেবান সরকার পাকিস্তানে হামলা চালানোর জন্য সন্ত্রাসীদের তাদের ভূখণ্ডে আশ্রয় দিচ্ছে। তবে পাক সরকারের এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে আফগানিস্তান।
আফগানিস্তানে চলতি বছর নিহতদের অধিকাংশই মাদক পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এটি আফগানিস্তানকে হতবাক করেছে। ঘটনাস্থলে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া জাতিসংঘ এবং হামলার পরেই ঘটনাস্থলে থাকা বিবিসির আফগান পরিষেবা দলগুলো নিশ্চিত করেছে যে, পাকিস্তানের ওই হামলায় চিকিৎসাধীন বেসামরিক নাগরিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এটিকে বেআইনি হামলা এবং সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ বলে অভিহিত করেছে।
তবে পাকিস্তান আফগানিস্তানে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। বিবিসিকে দেয়া এক বিবৃতিতে দেশটি বলেছে, কোনো হাসপাতাল, মাদক পুনর্বাসন কেন্দ্র বা বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি। লক্ষ্যবস্তু ছিল সামরিক ও সন্ত্রাসী অবকাঠামো। পাকিস্তানের এমন বিবৃতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মাসুদা। তিনি বিবিসিকে বলেন, “পাকিস্তান মিথ্যা বলছে। আমি নিজে দেখেছি ওটা কোনো সামরিক শিবির ছিল না। সেখানে এমন ব্যক্তিদের ভর্তি করা হয়েছিল যারা সুস্থ হয়ে নিজেদের পরিবারের কাছে ফিরতে চেয়েছিলেন।”
শুধু মাসুদা একা নন, বিবিসি ৩০ জনেরও বেশি ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়ে মাদকাসক্তি থেকে সেরে ওঠা ব্যক্তিদের পরিবার ও কেন্দ্রটির কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি। এসব ব্যক্তি পাকিস্তানের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ওই পুনর্বাসন কেন্দ্রে হামলার সময় দায়িত্বে থাকা এক চিকিৎসক বিবিসিকে বলেন, গত ১৬ মার্চ স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৫০ নাগাদ কাবুল-জালালাবাদ মহাসড়কের পাশে অবস্থিত স্থাপনাটিতে তিনটি বোমা পড়ে। তিনি নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি, কারণ তালেবান সরকারের পক্ষ থেকে কথা বলার কোনো অনুমতি তিনি পাননি।
ওই চিকিৎসক বলেন, একটি বোমা পুনর্বাসন কেন্দ্রে হ্যাঙ্গারের মতো একটি কাঠামোতে আঘাত হানে। সেখানে সাধারণত নতুন ভর্তি হওয়া রোগীদের রাখা হয়। অন্য দুটি বোমা রোগীদের রাখার কন্টেইনার ও কাঠের ব্লক, সেই সঙ্গে খাদ্য গুদাম এবং প্রশাসনিক, নিরাপত্তা ও সহায়ক কর্মীদের কার্যালয়ে আঘাত হানে। এই হামলা নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়, হতাহতদের ক্ষতির প্রধান কারণ ছিল স্প্লিন্টারের আঘাত ও দগ্ধ হওয়া। এতে আরও বলা হয়েছে যে, আঘাতের তীব্রতার কারণে বা দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ায় বেশ কয়েকটি মৃতদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ওই চিকিৎসক বিবিসিকে আরও বলেছেন, “আমি আমার জীবনে এমন ভয়াবহ দৃশ্য কখনো দেখিনি।”
