দীর্ঘ প্রায় এক দশক পর তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীনে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাকে বহনকারী বিমানটি বুধবার বেইজিংয়ে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। ট্রাম্পের এই সফরে সঙ্গী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বড় টেক কোম্পানিগুলোর বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা জায়গা পেয়েছেন।
সেই তালিকায় অ্যাপলের শীর্ষ কর্মকর্তা টিম কুক, টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান ইলন মাস্ক এবং ব্ল্যাকরকের ল্যারি ফিঙ্ক রয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে। এছাড়া মেটার ভাইস চেয়ারম্যান ডিনা পাওয়েল ম্যাককর্মিক, ভিসার প্রধান নির্বাহী রায়ান ম্যাকলনার্নি, বোয়িংয়ের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কেলি ওর্টবার্গ, ব্ল্যাকস্টোনের প্রধান নির্বাহী স্টিফেন শোয়ার্জম্যান, কার্গিলের প্রধান নির্বাহী ও চেয়ারম্যান ব্রায়ান সাইকসসহ আরও বেশ কিছু মার্কিন কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও যাচ্ছেন।
সফর পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, সবমিলিয়ে ট্রাম্পের এই সফরে ডজনেরও বেশি মার্কিন টেক কোম্পানির শীর্ষ কর্তারা থাকছেন। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ট্রাম্পকে স্বাগত জানানোর জন্য বড় আয়োজন করছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সম্মানে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বিশেষ ভোজসভার।
চীনের শীর্ষ নেতা বিশেষ এসব আয়োজনের মাধ্যমে ট্রাম্পকে সমাদর ও আপ্যায়ন করবেন, তখন তার নিশ্চয়ই ২০১৭ সালের স্মৃতি মনে পড়বে। শেষবার ওই বছর তিনি চীন সফরে এসেছিলেন। সেই সময়েও তার সম্মানে নানান আয়োজন ও বিশেষ আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এমনকি চীনের যে শহরে জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ, সেখানে নৈশভোজের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যা ট্রাম্পের আগে মার্কিন আর কোনো প্রেসিডেন্টের সম্মানে করা হয়নি।
এবারের সফর ঘিরেও এ ধরনের চমকপ্রদ বিশেষ সংবর্ধনা ও জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন থাকছে বলে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সম্মানে এবার ঝংনানহাইয়ের অন্দরমহলে নৈশভোজ রাখা হতে পারে, যেটা চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের বাসস্থান ও কর্মস্থল। অন্দরমহলটি নিষিদ্ধ শহরের পাশেই অবস্থিত।
ট্রাম্পের চীন সফরের আলোচ্যসূচি বেশ জটিল হবে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ দ্বিপাক্ষিক উন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য, বাড়তি শুল্ক ও প্রযুক্তির পাশাপাশি তাইওয়ান ও ইরান ইস্যু এবারের আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। এক্ষেত্রে আলোচনা সফল না হলে দু’পক্ষের মধ্যে উত্তেজনাও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এক দশক পর ট্রাম্প যখন দ্বিতীয় দফায় বেইজিং যাচ্ছেন, তখন দেশটিতে অনেক কিছুই ব্যাপকভাবে বদলে গেছে। চীন এখন আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী এবং অনেক বেশি দৃঢ়চেতা। তৃতীয় মেয়াদের অনেকটা পথ পেরোনো চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী নেতা শি জিনপিং তার দেশে নবায়নযোগ্য শক্তি, রোবটিক্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাখাতে ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ বাড়িয়েছেন। এর মাধ্যমে ‘নতুন উৎপাদন শক্তি’র পরিকল্পনা নিয়ে তিনি ভবিষ্যতের দিকে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও সফরসঙ্গীরা যদি আগামীর চীনকে এক ঝলক দেখতে চান, তাহলে তাদের রাজধানী বেইজিংয়ের বাইরেও দৃষ্টি দিতে হবে। চীনের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডজুড়ে সৌর ও বায়ু শক্তি এখন রীতিমতো আধিপত্য বিস্তার করে ফেলেছে। আর দক্ষিণে স্বয়ংক্রিয় কারখানা ও পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খলাকে নতুন রূপে সাজানো হচ্ছে। চংকিং শহরের মতো মেগা সিটিগুলোর অভূতপূর্ব উন্নতি এখন রীতিমতো পর্যটন ও সামাজিক মাধ্যমের কনটেন্ট ক্রিয়েটর বা ইনফ্লুয়েন্সারদের ভিডিওর বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক বিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষণা ও পরামর্শ উপদেষ্টা আলি ওয়াইন বিবিসিকে বলেছেন, ২০১৭ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন চীন সফরে গিয়েছিলেন, তখন চীনারা প্রমাণ করার চেষ্টা করছিল যে তারা অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সমকক্ষ। “কিন্তু এই সফরে আমার কাছে যে বিষয়টি বিস্ময়কর বলে মনে হচ্ছে, তা হলো চীনের এবার গতবারের মতো নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ হিসেবে দেখানোর কোনো প্রয়োজনই পড়ছে না। কারণ ওয়াশিংটন এখন চীনকে নিজের প্রায় সমকক্ষ হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে,” বলেন মি. ওয়াইন। সবদিক বিবেচনায় বেইজিংকে এখন ‘যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিযোগী’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এই বিশ্লেষক।
চংকিং শহরের অসংখ্য নতুন বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোর একটিতে গিয়েছিল বিবিসি। সেখানে দোতলায় অত্যাধুনিক একটি গবেষণাগারে দেখা গেল কিন্ডারগার্টেনে পড়া একদল শিশু একটি রোবট মাছকে ট্যাঙ্কের মধ্যে সাঁতার কাটতে দেখে আনন্দে খিলখিল করে হাসছে। চীনে বিভিন্ন ধরনের রোবট দেখা যায়। এর মধ্যে হিউম্যানয়েড রোবটগুলো মানুষের মতো আচরণ করে। তাদের কুংফু ও চমৎকার নাচ দেখে অনেকেই মজা পেয়ে থাকেন। গবেষণাগারটিতে বিবিসি গিয়েছিল, সেখানকার শিশু শিক্ষার্থীরা ক্যামেরার সামনে নিজেদের প্রতিভা দেখাতে রীতিমতো উদগ্রীব হয়ে ওঠে।
চীনের শিল্প কারখানাগুলোতে ইতোমধ্যেই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক শিল্প রোবট কাজ করছে। রোবটিক্স খাতে চীন প্রতিবছরই বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। কেবল চলতি বছরেই চীন রোবটিক্সখাতে প্রায় চারশ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করছে। এসব বিনিয়োগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চংকিং শহর, যার লক্ষ্য নিজেকে পশ্চিম চীনের সিলিকন ভ্যালি হিসেবে গড়ে তোলা। এক্ষেত্রে আমেরিকান সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে, বিশেষ করে উন্নত মানের চিপের জন্য।
চীন এখন মার্কিন প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার কাছ থেকে আরও উন্নতমানের এআই চিপ কিনতে আগ্রহী। ২০২২ সালে বাইডেন প্রশাসন অত্যাধুনিক সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ বন্ধ করে চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিক্স শিল্পকে রুখে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতা নেওয়ার পর সেই নীতি কিছুটা শিথিল করেছেন। গত বছর তিনি এনভিডিয়াকে তাদের কিছু উন্নত চিপ চীনে বিক্রি করার অনুমতি দেন। যদিও সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ভালো চিপগুলো নয় বলে জানা যাচ্ছে।
এদিকে, গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রপ্তানি প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। তারপরও দেখা যাচ্ছে, ওয়াশিংটন এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর চীনের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ট্রাম্পের শেষ সফর ব্যাপক জাঁকজমকপূর্ণ হলেও সেটি যুক্তরাষ্ট্রকে চীনা পণ্যের ওপর বিপুল শুল্ক আরোপ করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। চীন এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়েছে। সেজন্য ২০২৪ সালে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই চীনা কর্মকর্তারা কাজে লেগে পড়েন। তারা ওয়াশিংটনের থিঙ্ক ট্যাঙ্কের বৈঠকে যোগ দেন, যেখানে ট্রাম্প আবারও সতর্ক করে বলেছিলেন যে, চীনের অন্যায্য বাণিজ্য কার্যকলাপ তিনি দ্রুতই নিয়ন্ত্রণে আনবেন।
গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন যখন নতুন করে শুল্ক আরোপ করা শুরু করলো, তখন চীনই একমাত্র দেশ ছিল যারা তাদের অবস্থান থেকে পিছু হটেনি। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দু’পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ চলবে নাকি চুক্তির মাধ্যমে সেটির সমাধান হবে, সেটাই এই সফরের অন্যতম বড় প্রশ্ন। তবে গত এক বছরে বেইজিং অবশ্যই আরও সাহসী হয়ে উঠেছে। “আমরা মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরশীল নই,” বলেন লুসিয়া চেন, যিনি চংকিং শহরের সাহিয়ু নামক একটি প্রতিষ্ঠানের হয়ে বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি করেন। আত্মনির্ভরশীলতার এই প্রচেষ্টায় চংকিং চীনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর। গাড়ি উৎপাদনের ক্ষেত্রে এই মেগাসিটি চীনে শীর্ষস্থানে রয়েছে এবং বিশ্বের বৃহত্তম গাড়ি নির্মাতা হিসেবে চীনের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
প্রেসিডেন্ট শি ওই শহর থেকে মধ্য এশিয়ার মধ্য দিয়ে ইউরোপ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে সরাসরি রেল সংযোগ স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন। লুসিয়া চেন মনে করেন, রেল সংযোগটি স্থাপন করা গেলে সেটি গ্রাহকদের কাছে আরও বেশি পণ্য বিক্রির জন্য সহায়ক হবে। “চংকিংয়ের ইভি শিল্পের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নিয়ে আমি বেশ আশাবাদী। আমার পরিবার ও বন্ধুরা সবাই জ্বালানিচালিত গাড়ি ছেড়ে বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহার শুরু করেছে। এছাড়া ইরান যুদ্ধের কারণে পেট্রোলের দাম অনেক বেড়ে গেছে এবং অনেক ক্রেতা প্রথমবারের মতো বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনার কথা ভাবছেন,” বলছিলেন লুসিয়া চেন।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দীর্ঘায়িত হওয়া সত্ত্বেও ট্রাম্প আংশিকভাবে যুদ্ধ শেষ করার চেষ্টায় চীনে আসছেন। তিনি তেহরানের সঙ্গে একটি চুক্তি সম্পাদনে চীনের সাহায্যের আশা করছেন। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ঝুলে থাকা চুক্তিটি চীনের সহযোগিতায় করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন অনেকে। সেটি সম্ভব হলে ট্রাম্পের লক্ষ্য পূরণ হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট একথা বলে গর্ব করতে ভালোবাসেন যে প্রেসিডেন্ট শি’র সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক রয়েছে। ফলে তিনি এই সফরে সেই সম্পর্কটি কাজে লাগাতে চাইবেন। বেইজিং সফরে ট্রাম্প এমন কিছু অর্জন নিয়ে দেশে ফিরতে চাইবেন, যা প্রচার করে তিনি রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারেন।
