একটি সাধারণ প্রাণীর কামড় বা আঁচড়কে আমরা অনেক সময় গুরুত্ব দেই না। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই অবহেলা থেকেই কখনো কখনো প্রাণঘাতী র্যাবিস বা জলাতঙ্ক রোগ সংক্রমণের শুরু হতে পারে। এটি একটি মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগ, যা একবার মানবদেহে প্রবেশ করলে ধীরে ধীরে স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে। রোগের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর পরিণতি মৃত্যুর দিকে গড়ায়। তবে সঠিক সময়ে সচেতনতা ও চিকিৎসা গ্রহণ করলে এই রোগ সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
চিকিৎসকদের মতে, র্যাবিস নিয়ে অবহেলা নয়, বরং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়াই জীবন রক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে শিশু, গ্রামীণ এলাকা এবং পথকুকুরের সংস্পর্শে থাকা মানুষদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে আনুমানিক ৫৯ হাজার মানুষ র্যাবিসে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এই মৃত্যুর অধিকাংশই ঘটে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৯৫ শতাংশ। বাংলাদেশেও প্রতিবছর বহু মানুষ এই রোগে প্রাণ হারান।
র্যাবিস একটি প্রাণঘাতী ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত আক্রান্ত প্রাণীর লালার মাধ্যমে ছড়ায়। সাধারণত কুকুর, বিড়াল, বানর বা অন্যান্য আক্রান্ত প্রাণীর কামড়, আক্রান্ত প্রাণীর আঁচড় (বিশেষ করে যদি সেখানে লালা লেগে থাকে), এবং চোখ, মুখ বা খোলা ক্ষতের মাধ্যমে ভাইরাস প্রবেশের কারণে এটি ছড়ায়। শিশুরা এই ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি থাকে, বিশেষ করে যেসব এলাকায় পথকুকুরের সংখ্যা বেশি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, র্যাবিস ভাইরাস মানবদেহে প্রবেশ করার পর সাধারণত ১ থেকে ৩ মাস পর্যন্ত নিঃশব্দ অবস্থায় থাকতে পারে। এই সময়কে ইনকিউবেশন পিরিয়ড বলা হয়। তবে এটি ব্যক্তিভেদে পরিবর্তিত হতে পারে—কখনো এক সপ্তাহেরও কম সময় আবার কখনো এক বছরের বেশি সময় লাগতে পারে। এই পর্যায়ে সাধারণত কোনো লক্ষণ দেখা যায় না, কারণ ভাইরাস ধীরে ধীরে স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কের দিকে অগ্রসর হয়।
র্যাবিসে আক্রান্ত হওয়া মানেই সঙ্গে সঙ্গে লক্ষণ দেখা দেওয়া নয়। এটি ধীরে ধীরে কয়েকটি ধাপে প্রকাশ পায়। প্রাথমিক ধাপে জ্বর, মাথাব্যথা, দুর্বলতা এবং কামড়ের স্থানে ব্যথা বা ঝিনঝিন অনুভূতি দেখা দেয়। পরবর্তী ধাপে অস্থিরতা, ভয়, আচরণগত পরিবর্তন এবং মানসিক অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। অগ্রসর ধাপে পানি বা বাতাসের প্রতি ভয় (হাইড্রোফোবিয়া), গিলতে সমস্যা, খিঁচুনি এবং পক্ষাঘাত দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত শ্বাসকষ্ট এবং স্নায়ুতন্ত্র সম্পূর্ণভাবে বিকল হয়ে মৃত্যু ঘটে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাণীর কামড় বা আঁচড় লাগলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ কিছু লক্ষণ দেখা দিলে এটি আরও জরুরি হয়ে যায়, যেমন কামড়ের স্থানে তীব্র ব্যথা বা ঝিনঝিন অনুভূতি, আচরণগত পরিবর্তন বা অস্থিরতা, এবং পানি বা বাতাসের প্রতি অস্বাভাবিক ভয়। শিশুদের ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্কতা প্রয়োজন, কারণ তারা অনেক সময় লক্ষণ স্পষ্টভাবে বলতে পারে না। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি বেশি, তাই দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
র্যাবিস প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ, তবে এর জন্য দ্রুত ও সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কামড় বা আঁচড় লাগার পর অন্তত ১৫ মিনিট ধরে সাবান ও পানি দিয়ে ক্ষতস্থান ভালোভাবে ধুতে হবে, দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী র্যাবিস টিকা গ্রহণ করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন নিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো চিকিৎসা নিলে এই রোগ শতভাগ পর্যন্ত প্রতিরোধ করা সম্ভব।
র্যাবিস এমন একটি রোগ, যা প্রতিরোধযোগ্য হলেও অবহেলা করলে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। তাই প্রাণীর কামড়কে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। সঠিক সময়ে সচেতনতা, দ্রুত চিকিৎসা এবং টিকা গ্রহণই জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়। বিশ্বজুড়ে র্যাবিস সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর ২৮ সেপ্টেম্বর পালিত হয় বিশ্ব র্যাবিস দিবস। এই দিনটি ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুরের মৃত্যুদিবস, যিনি র্যাবিসের প্রথম কার্যকর টিকা উদ্ভাবন করেছিলেন।
