পুলিশের ইউনিফর্ম বদলের কয়েকটি অদ্ভুত গল্প

পুলিশের ইউনিফর্ম বদলের কয়েকটি অদ্ভুত গল্প

বাংলাদেশে আবার নতুন করে পুলিশের ইউনিফর্ম বা পোশাক বদলানো হলো। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে জেলা পুলিশের শার্ট হবে গাঢ় নীল, মহানগর পুলিশের শার্ট হালকা জলপাই (লাইট অলিভ) আর সবার ট্রাউজার বা প্যান্ট হবে ঐতিহ্যবাহী খাকি রঙের।

সাধারণত যেকোনো বাহিনীর পোশাক পরিবর্তনের পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকে। যেমন প্রশাসনিক প্রয়োজন, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিকায়ন, কিংবা জনমনে বাহিনীর ভাবমূর্তি পুনর্গঠন করা। কিন্তু ইতিহাস বলে, পোশাক বদলানোর উদ্দেশ্য সবসময় সফল না-ও হতে পারে। বরং অনেক সময় একেবারে উল্টো ও হাস্যকর সব ঘটনাও ঘটে।

ইতালির মানুষ ফ্যাশনের জন্য বিশ্ববিখ্যাত। তাই তাদের পুলিশ বাহিনীকেও দেখতে অনেক বেশি স্মার্ট ও আকর্ষণীয় লাগে। বিশেষ করে দেশটির জাতীয় সামরিক পুলিশ কারাবিনিয়েরির ইউনিফর্ম বিশ্বের অন্যতম সুন্দর পুলিশ পোশাক হিসেবে পরিচিত। ১৯৮০-এর দশকে বিখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার জর্জিও আরমানি তাদের আধুনিক ইউনিফর্ম ডিজাইন করেন। পরে ভ্যালেন্টিনোসহ অন্যান্য ডিজাইনাররাও তাদের পোশাকে ডিজাইনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কালো রঙের সুন্দর কোট, লাল ডোরা দেওয়া প্যান্ট, চকচকে বোতাম, বিশেষ টুপি (লুসেরনা)—সব মিলিয়ে তাদের দেখলে মনে হয় ডিউটিতে নয়, যেন কোনো ফ্যাশন শো’র ক্যাটওয়াক চলছে। ফলে পর্যটকরা প্রায়ই তাদের সাথে ছবি তুলতে ভিড় করেন।

আধুনিক পুলিশের জনক স্যার রবার্ট পিল ১৮২৯ সালে লন্ডনে প্রথম সংগঠিত মেট্রোপলিটন পুলিশ বাহিনী গড়েন। তখন ব্রিটিশ জনগণ সামরিক বাহিনীকে (লাল কোট পরা) খুব ঘৃণা করত, কারণ তারা প্রায়ই দমন-পীড়ন চালাত। পিল চাইলেন পুলিশকে সামরিক বাহিনীর মতো না দেখিয়ে জনবান্ধব করতে। তিনি গাঢ় নীল রঙের পোশাক বেছে নেন। তাতে কোনো লাভ অবশ্য হলো না। ওই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে এক হাজার পুলিশ সদস্য (যাদের ‘পিলার্স’ বা ‘ববিস’ বলা হতো) লন্ডনের রাস্তায় টহল দিতে শুরু করেন। অনেক লন্ডনবাসী ভাবল, এটা হয়তো সরকারের লুকানো সামরিক বাহিনী বা গোয়েন্দা দল। ছদ্মবেশে তাদের ওপর নজরদারি করছে। শুরুর দিকে পুলিশ দেখলেই মানুষ তেড়ে যেত এবং গালিগালাজ করত। পরে অবশ্য ধীরে ধীরে এই ভয় কমে যায়।

২০০৪ সালে মার্কিন সেনাবাহিনী প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার খরচ করে একটা ‘সর্বজনীন’ ক্যামোফ্লেজ পোশাক (ইউনিভার্সাল ক্যামোফ্লজ প্যাটার্ন বা ইউসিপি) তৈরি করে। উদ্দেশ্য ছিল একই পোশাক মরুভূমি, জঙ্গল, শহর—সব জায়গায় সৈন্যদের লুকিয়ে রাখবে। তবে বাস্তবে তা কোথাও কাজ করেনি। ইরাক-আফগানিস্তানের মরুভূমিতে এই পোশাকের সৈন্যদের দূর থেকে স্পষ্ট চেনা যেত। সৈন্যরা ঠাট্টা করে বলত, ‘এটা শুধু এক জায়গায় লুকানোর জন্য ভালো, ঠাকুমার বাড়ির পুরোনো ধূসর সোফার ওপর।’ শেষমেশ বিপুল অর্থ অপচয়ের পর ২০১০ সালের দিকে এই পোশাক বাতিল করতে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র।

উনিশ শতকের শেষভাগে নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্ট (এনওয়াইপিডি) নিয়ম করেছিল, প্রত্যেক অফিসারকে বড় গোঁফ রাখতে হবে এবং উঁচু টুপি পরতে হবে। এতে করে অপরাধীরা ভয় পাবে এবং পুলিশকে আরও গম্ভীর দেখাবে। কিন্তু বিপত্তি বাধল তরুণ পুলিশদের নিয়ে। তাদের মুখে ঠিকমতো গোঁফই গজাত না। চাকরি বাঁচাতে তারা থিয়েটারের কৃত্রিম গোঁফ আঠা দিয়ে লাগিয়ে ডিউটি করতেন। চোর-ডাকাত ধরতে গিয়ে দৌড়ানোর সময় প্রায়ই আঠা ছুটে পুলিশের গোঁফ ঝুলে পড়ত বা উঁচু টুপি বাতাসে উড়ে যেত। অপরাধীরাও ভয় পাওয়ার বদলে হাসিতে গড়াগড়ি খেত।

বাংলাদেশ পুলিশের পোশাকের শুরু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে। তখন মূল রঙ ছিল খাকি। পাকিস্তান আমলেও একই ধারা চলতে থাকে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও বাঙালি পুলিশ সদস্যরা খাকি পোশাক পরেই লড়াই করেন। স্বাধীনতার পরও দীর্ঘদিন খাকি ইউনিফর্ম চালু ছিল। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে ২০০৪ সালে। তখন খাকি পোশাকের যুগ শেষ করে মহানগর পুলিশের জন্য হালকা জলপাই এবং জেলা পুলিশের জন্য গাঢ় নীল শার্ট চালু হয়। লক্ষ্য ছিল পুলিশকে আরও আধুনিক ও পেশাদার দেখানো এবং সেনাবাহিনী থেকে আলাদা করা। ২০০৯ সালে লোগো, ব্যাজ ও কিছু কাপড়ে ছোটখাটো পরিবর্তন হয়।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। জনমনে পুলিশের ভীতি দূর করতে ও ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে নতুন পোশাক চূড়ান্ত করা হয়। তখন শার্ট ছিল আয়রন-ধূসর (লোহা-ধূসর) এবং প্যান্ট ছিল কফি-বাদামি রঙের। কিন্তু মাত্র সাত মাস পর চলতি বছরের জুনে বিএনপি সরকারের আমলে এই সিদ্ধান্ত বাতিল করা হলো। এবার আগের রঙ (গাঢ় নীল ও হালকা জলপাই শার্ট) ফিরিয়ে আনা হলো এবং প্যান্ট খাকি রঙের করা হলো।

তবে বাংলাদেশ পুলিশের এই পোশাক বা ইউনিফর্ম বদল মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকর হবে এবং জনগণের সঙ্গে দূরত্ব ঘুচিয়ে উদ্দেশ্য পূরণে কতটা সহায়ক হবে—তা সময়ই বলে দেবে।

আরও পড়ুন