এনসিপির জোট সংকট: আদর্শ, বাস্তবতা ও রাজনৈতিক ঝুঁকি

এনসিপির জোট সংকট: আদর্শ, বাস্তবতা ও রাজনৈতিক ঝুঁকি

রাজনীতিতে জোট মানেই শুধু আসন সমঝোতা নয়, বরং এর সাথে জড়িত আদর্শ, নেতৃত্ব এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো কেমন হবে সেই প্রশ্ন। সেই জায়গা থেকেই তরুণদের বিপ্লবী দল এনসিপি এখন গভীর সংকটে দাঁড়িয়ে আছে। প্রশ্নটা খুব সরল হলেও, কেন এনসিপি বিএনপির সঙ্গে জোটে যেতে পারলো না, অথবা জামায়াতের সঙ্গে যাওয়ার মুল ফ্যাক্টর গুলো কি কি? জোটে গেলে কী হবে, না গেলে কী হবে? 
এই সকল প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের আগে জানতে হবে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে। বাংলাদেশ মূলত দীর্ঘ সময় ধরেই দেশের দুই বড় দলের (বিএনপি ও আওয়ামী লিগ) শাসন দেখেছে। এই দুই দলের রাজনীতিই গড়ে উঠেছে পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্বের ওপর। শেখ পরিবার ও জিয়া পরিবার। কেউ স্বীকার করুক আর না করুক। দুই পরিবার’ই কার্যত দুই দলের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। নেতৃত্ব নির্বাচন, নীতিনির্ধারণ, কিংবা ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকার সবকিছুই একটি পূর্বনির্ধারিত বৃত্তের মধ্যে আবর্তিত।

তরুণদের নতুন দল এনসিপি ঠিক এখানেই ভিন্ন। দলটির প্রথম ধারনা বলেন আর স্লোগান বলেন, একজন কৃষকের ছেলেও প্রধানমন্ত্রী হতে পারে, এটিই হচ্ছে তাদের ফিলসফি। সত্যি বলতে এই লাইনটা নিছক একটি স্লোগান নয়, এটি একটি কাঠামোগত রাজনীতির ইঙ্গিত। এনসিপি চায় কাউন্সিলরদের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন, সভাপতি–সাধারণ সম্পাদকের নির্দিষ্ট মেয়াদের পর নেতৃত্ব রোটেশন। অর্থাৎ ক্ষমতা কারো পারিবারিক এবং ব্যক্তিগত কোনো সম্পদ না, বরং তাদের ভাষায় এটা হবে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দায়িত্ব। 

এই দর্শন বিএনপির সঙ্গে মৌলিকভাবে কিছুটা সাংঘর্ষিক। বিএনপির ভেতরে আনুষ্ঠানিক কাঠামো থাকলেও বাস্তবে নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্তের জায়গা বহুদিন ধরেই কেন্দ্রীয়ভাবে জিয়া পরিবারের মধ্যেই নিয়ন্ত্রিত। ফলে আদর্শিকভাবে এই দুই রাজনৈতিক দলের দর্শনের মিল ঘটানো প্রায় অসম্ভব। জোট হলেও সেখানে নেতৃত্বের প্রশ্নে এনসিপিকে এক ধরনের আত্মসমর্পণের মুখে পড়তে হবে। বিশেষ করে জোটের মুখ হিসেবে তারেক রহমানকে মেনে নেওয়া এনসিপির জন্য বিশাল রাজনৈতিক ঝুঁকি। কারণ এতে করে তাদের ‘নতুন রাজনীতির’ ধারণাটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে। যারা এতদিন ধরে স্লোগান দিয়েছে, একজন কৃষকের সন্তানরাও এমপি কিংবা মন্ত্রী হতে পারে, এখন সেখান থেকে সরে গিয়ে পুরোনো রাজনীতির ছায়াতলেই ডুবে যেতে হবে শুধু মাত্র কয়েকটা সংসদীয় আসন এবং ক্ষমতার ছায়াতলে থাকার জন্য। 

অন্যদিকে জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির একটি কাঠামোগত মিল আছে। দলের ভেতরে নেতৃত্ব পরিবর্তনের সুযোগ, মেয়াদভিত্তিক পদ এবং তুলনামূলকভাবে সংগঠিত সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া। শুধু কাগজে কলমে নয়, জামায়াতে যে কেউ দলের প্রধান হতে পারেন এই ধারণাটি এনসিপির ঘোষিত দর্শনের সঙ্গে এক। সেই সঙ্গে বাস্তব রাজনীতির একটা বড়ো সুবিধাও এখানে স্পষ্ট।

যেমন এককভাবে নির্বাচনে গেলে এনসিপির ভোটপ্রাপ্তি খুব বেশি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। অনেক বিশ্লেষকের মতে, তা ৩–৪ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। এই পরিমাণ ভোট জাতীয় রাজনীতিতে বক্তব্য রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু জামায়াতের সঙ্গে জোট হলে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। দুই দলের ভোট একত্র হলে মোট ভোটব্যাংক স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পাবে। এতে শুধু সরাসরি আসন জয়ের সম্ভাবনাই বাড়বেনা, বরং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা উচ্চকক্ষে এনসিপির জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করবে। আবার বিএনপির সাথে জোট করলেও ১০টির বেশী আসনে ছাড় পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, আর জামায়াতের সাথে শোনা যাচ্ছে ৩০টি আসনের কথা। এখানে একটা বড়ো সুবিধা পাচ্ছে এনসিপি। কারণ, তারা যদি এককভাবে কোনো আসনেও না জিততে পারে, এরপরেও ৩০ টি আসনের মোট ভোট প্রায় ৮/১০% ছাড়াতে পারে। যার ফলে উচ্চকক্ষে তাদের একটা শক্ত অবস্থান তৈরি হবে, আর বিএনপির সাথে জোটে গেলেও ৮/১০ টি আসনে বড়ো জোর ২/৩% ভোট পেতে পারে। যদিও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর জন্য সেই সম্ভাবনাও ক্ষীণ। নিম্নকক্ষ এবং উচ্চকক্ষ মিলে মিনিমাম ৮/১০ জন এমপি এনসিপি সংসদে না পাঠাতে পারলে তাদের গুরুত্ব অনেকটাই কমে যাবে । সংখ্যায় কম হলেও এই উপস্থিতি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখান থেকেই ভবিষ্যৎ দরকষাকষি, নীতিনির্ধারণী এবং জাতীয় বিতর্কে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে।

তবে এখানেই গল্প শেষ নয়। জামায়াতের সঙ্গে জোট করলেও এনসিপির সামনে বড়ো কিছু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। দেশের একটি অংশ এখনো জামায়াতকে দেখে অতীতের রাজনীতির ছায়ায়। যদিও সেই ন্যারেটিভ অনেকটাই ঘুছাতে পেরেছে বলে মনে হয় এবং এর প্রতিফলনও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা গেছে। এনসিপি যে ‘সুশীল রাজনীতি’ বা নতুন রাজনৈতিক ভাষা গড়তে চায়, সেখানে এই জোট তাদের ভাবমূর্তিকে কিছুটা জটিল করে তুলতে পারে। আন্তর্জাতিক পরিসরেও এর একটা রাজনৈতিক মূল্য আছে, যা দীর্ঘমেয়াদে এনসিপির কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এর বাহিরেও আরও একটি অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি এনসিপির ভেতরে রয়েছে। এনসিপির ভেতরেই কিছু অংশ আছে, যারা যে-কোনো একটি ধর্মভিত্তিক দলের সাথে আদর্শিক জোট নিয়ে নাখোশ। আর এই দ্বন্দ্ব সামাল দিতে পারলে দলের ভেতর থেকে অনেকেই পদত্যাগ করতে পারে এবং দল দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে। 

তবে এনসিপির জন্য বাস্তবতা কিছুটা কঠিন। কেননা কোনো জোটে না গেলে এনসিপির সামনে ভয়ংকর একটা সম্ভাবনা অপেক্ষা করছে। সেটা হচ্ছে সংসদে শূন্য উপস্থিতি। যদি দলের একজন প্রতিনিধিও সংসদে যেতে না পারে, তাহলে জনগণের চোখে এটি সহজেই ‘জনসমর্থনহীনতা’ হিসেবে চিহ্নিত হবে। তখন শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যতের রাজনৈতিক দরকষাকষির জায়গাটাও সংকুচিত হয়ে যাবে।
সব মিলিয়ে এনসিপির সামনে এখন আদর্শ ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব। বিএনপির সঙ্গে জোট মানে আদর্শ বিসর্জনের ঝুঁকি, আর জামায়াতের সঙ্গে জোট মানে কিছু রাজনৈতিক ভাবমূর্তিগত জটিলতা। তবে একই সঙ্গে বাড়তি ভোটব্যাংক ও সংসদীয় উপস্থিতির বাস্তব সুযোগও।
যদিও এই লড়াই হয়ত আসনের নয়, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন ধারা টিকিয়ে রাখতে এনসিপির কাছে এর বিকল্প নেই।

আরও পড়ুন