মুহাররমকে ‘আল্লাহর মাস’ বলা হয় যে কারণে

মুহাররমকে ‘আল্লাহর মাস’ বলা হয় যে কারণে

ইসলামি বর্ষপঞ্জির অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও পবিত্র মাস মুহাররম। অসংখ্য ফজিলত ও বৈশিষ্ট্যে মণ্ডিত এই মাস মুসলিম উম্মাহর কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মূলত কয়েকটি বিশেষ কারণে মুহাররমকে আল্লাহর মাস বলা হয়।

রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে এই মাসকে শাহরুল্লাহ বা আল্লাহর মাস হিসেবে নামকরণ করেছেন। ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, কোনো কিছুকে মহান আল্লাহর নিজের নামের সাথে জুড়ে দেওয়াটা সেই বিষয়ের সর্বোচ্চ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ বহন করে। কারণ আল্লাহ তাআলা তার সৃষ্টিজগতের মধ্যে শুধু বিশেষ ও সম্মানিত জিনিসকেই নিজের দিকে সম্বন্ধিত করেন।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মুহাররমের রোজা এবং ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ হলো রাতের নামাজ বা তাহাজ্জুদ।

এই মাসটি যেহেতু সরাসরি আল্লাহর নামের সাথে যুক্ত, তাই সমস্ত নফল ইবাদতের মধ্যে রোজাকে এই মাসের প্রধান আমল হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। কেননা রোজাও এমন একটি ইবাদত, যা সরাসরি আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করা হয়।

মুহাররমকে আল্লাহর মাস বলার আরেকটি তাৎপর্য হলো, এর পবিত্রতা স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা নির্ধারণ করেছেন। প্রাক-ইসলামি যুগে আরবরা নিজেদের সুবিধামতো পবিত্র মাসের সময় বদলে ফেলত। তারা মুহাররমের পবিত্রতাকে অন্য মাসে সরিয়ে দিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট করে দেন যে, এটি আল্লাহর নির্ধারিত পবিত্র মাস এবং মানুষের এই নিয়ম পরিবর্তন করার কোনো অধিকার নেই।

আরবরা আগে নিজেদের ইচ্ছেমতো এই মাসের পবিত্রতা ভাঙত বলে ইসলামে এর নাম দেওয়া হয় মুহাররম, যার অর্থ নিষিদ্ধ বা সম্মানিত। ইমাম জামাখশারি বলেন, পবিত্র কাবা শরিফকে যেভাবে বাইতুল্লাহ বা আল্লাহর ঘর বলে সম্মান দেওয়া হয়, ঠিক তেমনি এই মাসের মর্যাদা বোঝাতে একে আল্লাহর মাস বলা হয়েছে। প্রাচীনকালে এর নাম ছিল সফর আল-আউয়াল, কিন্তু ইসলাম আসার পর এর নাম রাখা হয় মুহাররম।

রমজান মাসের ফরজ রোজার পর নফল রোজার জন্য মুহাররমের চেয়ে উত্তম আর কোনো মাস নেই। ইমাম জামাখশারি মনে করেন, আশুরার ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণেই মুহাররমকে পবিত্র মাসগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে বেছে নেওয়া হয়েছে।

পবিত্র কোরআনের সূরা আত-তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধান ও কিতাবে মাসসমূহের সংখ্যা বারোটি, যেদিন তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন। সুতরাং তোমরা এই মাসগুলোতে নিজেদের প্রতি জুলুম করো না।

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, আল্লাহ তায়ালা এই চারটি মাসকে বিশেষভাবে সম্মানিত করেছেন এবং এই সময়ে যেকোনো পাপকাজের গুনাহ যেমন বেশি, তেমনি সৎকাজের সওয়াব ও মর্যাদাও বহুগুণ বেশি।

বিখ্যাত তাবেয়ী কাতাদাহ বলেন, পবিত্র মাসগুলোতে যেকোনো অন্যায় বা জুলুম অন্য সময়ের চেয়ে বড় অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। হযরত আবু বাকরা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, বছর বারো মাসে। এর মধ্যে চারটি মাস বিশেষ সম্মানের। তিনটি মাস পরপর আসে—জিলকদ, জিলহজ ও মুহাররম এবং অপরটি হলো রজব মাস।

পবিত্র চার মাসের মধ্যে কোনটি সবচেয়ে সেরা, তা নিয়ে আলেমদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। হাসান বসরীসহ একদল বিশিষ্ট আলেম মনে করেন, মুহাররম হলো এই চার মাসের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম। অন্যদিকে সাঈদ বিন জুবাইর জিলহজ মাসকে এবং শাফেয়ী মাজহাবের কোনো কোনো আলেম রজব মাসকে সেরা বলেছেন। তবে হাফিজ ইবনে রজবের মতে, মুহাররম এবং বিশেষ করে এর প্রথম দশ দিনই হলো সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ।

হিজরি নববর্ষের সূচনা হয় এই মুহাররম মাসের মাধ্যমেই। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ফারুক (রা.)-এর শাসনামলে সাহাবিদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে মুহাররমকে ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।

আরও পড়ুন