বাজেট বিতর্কে দুর্নীতি-ধীর বিচার নিয়ে ক্ষোভ, উঠল শেখ হাসিনার বিচার দাবি

বাজেট বিতর্কে দুর্নীতি-ধীর বিচার নিয়ে ক্ষোভ, উঠল শেখ হাসিনার বিচার দাবি

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির প্রধান দুটি সূচক বৈদেশিক বাণিজ্য ও প্রবাসী আয় নিয়ে জাতীয় সংসদে এক মিশ্র চিত্র উঠে এসেছে। একদিকে বিশ্বের ৫৮টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার শীর্ষে রয়েছে চীন ও ভারত। অন্যদিকে, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স অর্জিত হয়েছে, যার একক শীর্ষ উৎস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

একইসঙ্গে সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী ও সরকারি দলের সদস্যরা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের নানা অনিয়ম, বিগত আমলের গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্পের দুর্নীতি এবং দেশের চা বাগানগুলোর শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনা প্রকাশ করেছেন। এমনকি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার দাবিও উঠেছে সংসদ অধিবেশনে।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির সংসদকে জানান, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিশ্বের ৫৮টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, দেশের এই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি মূলত গুটিকয়েক প্রধান বাণিজ্য অংশীদারের মধ্যেই বেশি ঘনীভূত। শিল্প খাতের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, জ্বালানি পণ্য এবং মূলধনী যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে আমদানির ওপর কাঠামোগত নির্ভরশীলতার কারণেই এই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে।

জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের একক বৃহত্তম বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে চীনের সঙ্গে, যার পরিমাণ ১৭ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। চীন থেকে ভারী যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক্স পণ্য, শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনী পণ্যের উচ্চ আমদানির বিপরীতে ওই অর্থবছরে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল মাত্র ৬৯৪ দশমিক ৪৯ মিলিয়ন ডলার। বাণিজ্য ঘাটতির তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার। এই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ১ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হলেও এর বিপরীতে তুলা, রাসায়নিক, খাদ্যপণ্য এবং ভোগ্যপণ্যের বিপুল আমদানির কারণে এই বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে ৩ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার, সিঙ্গাপুরের সঙ্গে ২ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার এবং মালয়েশিয়ার সঙ্গে ২ দশমিক ০১ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি রেকর্ড করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে কাতারের সঙ্গে ২ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার এবং সৌদি আরবের সঙ্গে ১ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতিতে পড়েছে বাংলাদেশ। ইউরোপের মধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে ১ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার এবং দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিলের সঙ্গে ২ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি রয়েছে দেশের।

বাণিজ্য ঘাটতির এই উদ্বেগজনক চিত্রের বিপরীতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সংসদে এক স্বস্তিদায়ক খবর দেন। তিনি জানান, বাংলাদেশ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেকর্ড ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স অর্জন করেছে। একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স পেয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে, যার পরিমাণ ৪ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রেমিট্যান্সের ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সৌদি আরব থেকে ৪ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৪ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার এসেছে। এছাড়া যুক্তরাজ্য থেকে ৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ও মালয়েশিয়া থেকে ২ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার এসেছে। ইউরোপের মধ্যে ইতালির অবদান ছিল ১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার।

অর্থনীতির এই খতিয়ানের পাশাপাশি সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে ক্ষোভ ও মাঠপর্যায়ের নানা সংকটের কথা তুলে ধরেন সংসদ সদস্যরা। কুষ্টিয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল গফুর বর্তমান প্রস্তাবিত বাজেটকে দেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট হিসেবে উল্লেখ করলেও একে অতিমাত্রায় ঋণনির্ভর, উচ্চাভিলাষী এবং অবাস্তবায়নযোগ্য বলে সমালোচনা করেন। বাজেটে সুশাসনের চরম অভাব রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হলেও আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী তা মাত্র ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হবে, যা অর্জন করা অসম্ভব।

আব্দুল গফুর শিক্ষাখাতে ১৪ হাজার কোটি টাকার হিসাব মিলছে না বলে অভিযোগ তোলেন এবং তার নির্বাচনী এলাকার স্কুল-কলেজের জরাজীর্ণ ভবনের চিত্র তুলে ধরেন। স্বাস্থ্য খাতের সমালোচনা করে তিনি বলেন, মিরপুর ও ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভবনের বেহাল দশা। এছাড়া ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে গরিব রোগীরা দিনের পর দিন বারান্দায় পড়ে থাকে।

বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তির দাবি তুলে অত্যন্ত কঠোর বক্তব্য দেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহেনা আক্তার রানু। তিনি দাবি করেন, অতীতে যে ‘আয়নাঘরে’ বিরোধী দলের নেতাদের বসিয়ে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হতো, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে সেই একই চেয়ারে বসিয়ে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া উচিত। ফেনীর এই সংসদ সদস্য চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের শহীদদের কথা স্মরণ করে বলেন, পুলিশ আসামিদের ধরছে না এবং ধরলেও আদালত জামিন দিয়ে দিচ্ছে, ফলে নিহতদের পরিবারগুলো সঠিক বিচার পাচ্ছে না।

প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে এখনো বিগত সরকারের প্রভাবশালীরা বসে থেকে একটি দুষ্টচক্র হিসেবে কাজ করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তাদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, কর্মকর্তারা সরকারের রাজস্ব আদায়ের চেয়ে নিজেদের পকেট ভারী করতেই বেশি ব্যস্ত থাকেন, তাই রাজস্ব খাতে একটি ‘সার্জিক্যাল অপারেশন’ চালানো প্রয়োজন। ব্যাংকিং খাতের লুটপাট ও টাকা পাচারের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি ব্যাংক লুটেরাদের সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে সাধারণ গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার জোর দাবি জানান।

সংসদে গ্রামীণ অবকাঠামোর অনিয়ম নিয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। তিনি জানান, বিগত সরকারের শাসনামলে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কারের কর্মসূচির নামে টিআর, কাবিটা ও কাবিখা বরাদ্দ নিয়ে যে অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে, তার তদন্ত চলছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে যথাযথ কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. ফজলে হুদার প্রশ্নের জবাবে ত্রাণ মন্ত্রী আরও জানান, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও নদীভাঙনের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসে সরকার ডিজিটাল পূর্বাভাস প্রযুক্তি, সাইক্লোন প্রিপেয়ার্ডনেস প্রোগ্রামসহ নানা বহুমুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে এবং এ পর্যন্ত ৩২৭টি সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হয়েছে।

একই সংসদ সদস্যের অপর এক প্রশ্নের জবাবে খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী সংসদকে আশ্বস্ত করে বলেন, বর্তমান সরকার বাজারে চালের দাম স্থিতিশীল রাখতে বদ্ধপরিকর। সে লক্ষ্যে নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে এবং অবৈধ মজুতদার ও বাজার অস্থিতিশীলকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। হতদরিদ্রদের জন্য খাদ্যবান্ধব ডাটাবেজের মাধ্যমে ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় চাল বিতরণের পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে।

অধিবেশনের শেষভাগে দেশের চা বাগানগুলোর শ্রমিক অসন্তোষ ও নিরাপত্তার বিষয়টি উঠে আসে। সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্ডকার আবদুল মুক্তাদির জানান, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা অধিদপ্তর (এনএসআই) চা বাগানে শ্রমিকদের বকেয়া মজুরিকে কেন্দ্র করে শ্রম অসন্তোষ সংক্রান্ত একটি বিশেষ প্রতিবেদনে দেশের ৩১টি চা বাগানকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কিছু চা বাগানের মালিক বাগান রেখে পালিয়ে যাওয়ায় বাগান ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় এবং শ্রমিক অসন্তোষ তৈরি হয়। ঝুঁকিপূর্ণ বাগানগুলোর মধ্যে রয়েছে তারাপুর, প্রেমনগর, বিজয়া, পাত্রখোলা, লাক্কাতুরা, দলদলী ও দেউন্দিসহ ৩১টি বাগান। তবে সরকার ও চা বোর্ড বন্ধ হয়ে যাওয়া বুরজান ও ফুলতলা চা বাগান পুনরায় চালু করেছে এবং ন্যাশনাল টি কোম্পানির অবিক্রিত চা বিশেষ ব্যবস্থায় রপ্তানি করে শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি পরিশোধের উদ্যোগ নিয়েছে। চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার ফ্যামিলি কার্ড প্রদানের কার্যক্রম শুরু করেছে বলেও বাণিজ্যমন্ত্রী সংসদকে আশ্বস্ত করেন।

আরও পড়ুন