কৃষ্ণসাগরের রঙ কেন প্রতি বছর গরমে ফিরোজা হয়ে যায়

কৃষ্ণসাগরের রঙ কেন প্রতি বছর গরমে ফিরোজা হয়ে যায়

কৃষ্ণসাগর গভীর ও গাঢ় রঙের পানির জন্য বিখ্যাত হলেও প্রতি বছর কয়েক সপ্তাহের জন্য এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ধারণ করে। পুরো সাগরজুড়ে যেন উজ্জ্বল ফিরোজা রঙের ঘূর্ণিপাক, যা এতটাই বিশাল যে মহাকাশ থেকেও দেখা যায়। পেস স্যাটেলাইটের ছবিতে এই মৌসুমি রূপান্তর অসাধারণ দৃশ্য বিস্তারিতভাবে ফুটে উঠেছে।

এই উজ্জ্বল রঙের কারণ দূষণ বা অগভীর পানি নয়, বরং অণুবীক্ষণিক সামুদ্রিক জীবের বিস্তার, যা সমুদ্রের স্বাস্থ্য এবং পৃথিবীর কার্বন চক্র—উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সামুদ্রিক এই জীব হলো ককোলিথোফোরস, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি ভাসমান এক ধরনের ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন (উদ্ভিদকণা)।

স্থলভাগের উদ্ভিদের মতো ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনও সূর্যের আলো ব্যবহার করে সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে বেড়ে ওঠে এবং ক্ষুদ্র জুপ্ল্যাঙ্কটন থেকে শুরু করে মাছ ও তিমির জন্য সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের ভিত্তি গড়ে তোলে। ককোলিথোফোরসের বিশেষত্ব হলো, এদের প্রতিটি কোষ ক্যালসিয়াম কার্বোনেটের তৈরি ক্ষুদ্র প্লেটে আবৃত থাকে। যখন শত শত কোটি জীব একসঙ্গে বিস্তার লাভ করে, তখন পানি দুধসাদা-নীল বা ফিরোজা রঙ ধারণ করে; মূলত ওই প্লেটই সূর্যের আলোতে দেখা যায়।

কৃষ্ণসাগরের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই রঙিন বিস্তারকে ক্যামেরা বন্দি করেছে পেস স্যাটেলাইটে থাকা নাসার ওশান কালার ইনস্ট্রুমেন্ট, যা সমুদ্রের রঙের সূক্ষ্ম পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের জন্য তৈরি। কৃষ্ণসাগর ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত এবং বিভিন্ন জলপথ ধরে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে যুক্ত। এর অনন্য ভৌগোলিক অবস্থান, মৌসুম পরিবর্তনের সঙ্গে তাপমাত্রা ও পুষ্টি উপাদানের পার্থক্য প্রতি বসন্ত ও গ্রীষ্মের শুরুতে ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের বিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে।

তবে এরা সেখানে বাস করা একমাত্র অণুজীব নয়। মৌসুমের পরেই ডায়াটমের আধিক্য বেড়ে যায়। এই শৈবাল ক্যালসিয়াম কার্বোনেটের বদলে সিলিকা দিয়ে আবরণ তৈরি করে এবং সমুদ্রের চেহারায় ভিন্ন ধরনের প্রভাব ফেলে; যখন ডায়াটমের বিস্তার হয়, তখন সাগর আরও বেশি গাঢ় দেখায়। একেক মৌসুমে একেক উদ্ভিদকণার বিস্তারের কারণে কেবল সাগরের রঙই বদলায় না—পানির তাপমাত্রা, পুষ্টি উপাদানেও পার্থক্য হয়।

প্রতিটি ককোলিথোফোর এতটাই ক্ষুদ্র যে খালি চোখে দেখা যায় না, তবে সম্মিলিত সংখ্যা এত বিপুল যে মহাকাশ থেকে সমুদ্রের বিশাল অংশ ফিরোজা রঙের দেখা যায়। কার্বন চক্রে ভূমিকা: এই অণুজীবগুলো পৃথিবীর কার্বন পরিবহনে অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক ব্যবস্থার অংশ। ককোলিথোফোরস বেড়ে ওঠার সময় আশেপাশের পানি থেকে কার্বন শোষণ করে। এরা মারা গেলে তাদের ক্যালসিয়াম কার্বোনেটের প্লেটের সঙ্গে সেই কার্বনের একটি অংশ সমুদ্রতলের দিকে নেমে যায়, যার একটি অংশ দীর্ঘ সময় সমুদ্রতলের পলিতে চাপা পড়ে থাকতে পারে, যা সমুদ্রের উপরের স্তর থেকে কার্বন অপসারণে সহায়তা করে। এই প্রক্রিয়ায় ঠিক কত পরিমাণ কার্বন সঞ্চিত হয় এবং সমুদ্রের তাপমাত্রা, স্রোতের ধরন ও রাসায়নিক গঠনের পরিবর্তনের সঙ্গে তা কীভাবে বদলাতে পারে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো গবেষণা করছেন।

আরও পড়ুন