সিকৃবি ভিসির বিরুদ্ধে অনিয়ম ও রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ

সিকৃবি ভিসির বিরুদ্ধে অনিয়ম ও রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিকৃবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. আলিমুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অনিয়ম, রাজনৈতিক পক্ষপাত, নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, আর্থিক অনিয়ম এবং বিরোধী মতাবলম্বীদের হয়রানির একের পর এক অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিপক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়া এই উপাচার্য দায়িত্ব গ্রহণের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবের বলয়ে নিয়ে গেছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দাবির বিরুদ্ধে আয়োজিত একটি মানববন্ধনে অংশ নেন অধ্যাপক ড. আলিমুল ইসলাম। সমালোচকদের মতে, সেই অবস্থান ছিল ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বিপরীতে এবং তার প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে দলীয় প্রভাব ও প্রতিহিংসামূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার পরিবর্তে দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। নিজস্ব পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়ে নিয়োগ বোর্ড গঠন করে প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক ও একাডেমিক গুরুত্বপূর্ণ পদে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতপন্থী হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের বসানো হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিপরীতে বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে শোকজ, প্রশাসনিক হয়রানি, পদচ্যুতির চেষ্টা এবং নানা ধরনের চাপ প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে।

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি সার্জারি ও থেরিওজেনোলজি বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক অধ্যাপক ড. নাসরিন সুলতানা লাকিকে ঘিরে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা এবং জাতীয়তাবাদী চেতনার এই শিক্ষককে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে চাকরিচ্যুত করার চেষ্টা চলছে। তার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ, জাল বা বিকৃত নথি এবং ভুয়া প্রমাণের মাধ্যমে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগের অভিযোগও তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এর পেছনে ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কাজ করছে।

এ ছাড়া নির্বাচনকে সামনে রেখে তড়িঘড়ি নিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নির্দেশনা উপেক্ষা করে আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগ, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দলীয় বিবেচনায় পদায়ন এবং বিভিন্ন ক্রয়কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, গত এক বছরে প্রায় ৩০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে, যার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

এসব অভিযোগের পাশাপাশি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। অধ্যাপক ড. আলিমুল ইসলামের বয়স ইতোমধ্যে ৬৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী তার চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তিনি উপাচার্য পদে পুনর্বহাল বা বহাল থাকার জন্য জোর তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সমালোচকদের মতে, নিয়ম ভেঙে পদে টিকে থাকার এই তৎপরতা তার প্রশাসনিক দায়িত্বশীলতার প্রশ্নই শুধু নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠানিক মর্যাদাকেও ক্ষুণ্ন করছে।

সমালোচকদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি ও সুশাসনের পরিবর্তে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পাওয়ায় শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, বর্তমান প্রশাসনের কর্মকাণ্ডে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের দাবি, উপাচার্য অধ্যাপক ড. আলিমুল ইসলামের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হোক। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। তাদের মতে, তা না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম, গবেষণার পরিবেশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুনাম আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আরও পড়ুন