অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতায় হামের প্রাদুর্ভাব, ২৯৪ শিশুর মৃত্যু

অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতায় হামের প্রাদুর্ভাব, ২৯৪ শিশুর মৃত্যু

সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে অদক্ষতা ও উদাসীনতার কারণে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এই রোগে এখন পর্যন্ত ২৯৪ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত দেশের ৬১ জেলায় হামে আক্রান্তের সংখ্যা ৪৫ হাজার ছাড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত ও অব্যবস্থাপনার কারণেই এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। টিকা কেনার পদ্ধতি ও অর্থায়নের উৎস পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়ায় পুরো প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়, যা থেকে দেখা দেয় টিকার সংকট। শেষ পর্যন্ত টিকার মজুত তলানিতে নেমে আসে এবং শুরু হয় হামের প্রাদুর্ভাব। স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্দোলন ও কর্মবিরতি পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে।

বিশেষজ্ঞরা টিকাদান কর্মসূচির আওতা কমে যাওয়ার বিষয়ে বারবার সতর্ক করলেও অন্তর্বর্তী সরকার তাদের পুরো মেয়াদে কোনো বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করেনি। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি বা শেষ দিকে একটি বিশেষ হাম টিকাদান কর্মসূচি চালানোর কথা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) চতুর্থ ধাপ শেষ হয় ২০২৪ সালের জুনে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য ১ লাখ ৬ হাজার ১০০ কোটি টাকার পঞ্চম ধাপের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের মার্চে পুরো এইচপিএনএসপি বাতিল করে দেয় মন্ত্রণালয় এবং সিদ্ধান্ত হয়, টিকাদানসহ সব সেবা সরাসরি সরকারের নিয়মিত কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে।

একই সঙ্গে চতুর্থ ধাপের অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে কয়েকটি ‘ব্রিজিং প্রকল্প’ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও এসব প্রকল্প অনুমোদনে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত অনুমোদন মেলেনি। ফলে ক্রয়প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ায় নানা সেবা স্থবির হয়ে পড়ে। শুধু টিকাই নয়, ওপি বাতিলের প্রভাবে দেশের ১৪ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধ সরবরাহ কমে যায় এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এনসিডি কর্নারেও সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়।

অপারেশন প্ল্যান বাতিল এবং ব্রিজিং প্রকল্প অনুমোদনে দেরি হওয়ার পর ২০২৫ সালের আগস্টে ৮৪২ কোটি টাকা টিকা কেনার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর আগে ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে টিকা কিনত বাংলাদেশ। কিন্তু সেপ্টেম্বরে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সিদ্ধান্ত নেয়, অর্ধেক টিকা ইউনিসেফের মাধ্যমে এবং বাকি অর্ধেক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে কেনা হবে। ইউনিসেফ এ পরিবর্তনের তীব্র বিরোধিতা করেছিল।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, আগের ব্যবস্থায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক অনুমোদনেই লাইন ডিরেক্টর ইউনিসেফকে টিকার অর্ডার দিতে পারতেন। কিন্তু এখন রাজস্ব বাজেটের অর্থে টিকা কিনতে গেলে দুটি মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন লাগে, যা পেতে দুই থেকে তিন মাস সময় লেগে যায়। অন্যদিকে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার অভিজ্ঞতাও বর্তমান কর্মকর্তাদের কম।

সংকটের খবর আসতে শুরু করলে ২০২৫ সালের শেষ দিকে ইউনিসেফের কাছ থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকার টিকা বাকিতে কেনে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না। মার্চের মধ্যে সদর দপ্তরে হামসহ ছয় ধরনের টিকার মজুত শেষ হয়ে যায়। অথচ আগের কর্মসূচিতে অন্তত তিন মাসের অতিরিক্ত মজুত থাকত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে ‘অপর্যাপ্ত হার্ড ইমিউনিটি’র মধ্যে এই প্রাদুর্ভাব ঘটছে। অর্থাৎ পর্যাপ্ত সংখ্যক শিশু টিকা পায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান কর্মসূচির পতনের জেরেই এই বিপর্যয়।

আরও পড়ুন