গুলির ঘটনায় ওসির নির্দেশের কথা জানালেন কনস্টেবল

গুলির ঘটনায় ওসির নির্দেশের কথা জানালেন কনস্টেবল

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দিতে যাত্রাবাড়ী থানার কনস্টেবল নাহিদ মিয়া বলেছেন, বারবার না করা সত্ত্বেও ওসি তাকে গুলি সরবরাহ করতে বলেন। নিরুপায় হয়ে কয়েকশো রাউন্ড গুলি দিয়ে আসতে হয়েছে বলে জানান তিনি।

রোববার (৩ মে) ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ইমাম হাসান তাইম হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় ১২তম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন নাহিদ। তিনি যাত্রাবাড়ী থানার ওয়্যারলেস অপারেটর হিসেবে কর্মরত।

সাক্ষ্যে নাহিদ বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বিকেলে দায়িত্ব চলাকালীন বেতারে একটি বার্তা দেন ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে কিলিং পজিশনে শিসা বুলেট ও চায়না রাইফেলের গুলি চালানো হবে বলে জানান তিনি। এরপর বিভিন্ন স্থানে গুলি বর্ষণ করা হয়। ওই দিন সন্ধ্যা ৬টায় বেতারের মাধ্যমে শিসা গুলি চান তৎকালীন এসি (ডেমরা জোন) নাহিদ ফেরদৌস।

বিষয়টি তাৎক্ষণিক যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ওসি আবুল হাসানকে জানানো হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন এই কনস্টেবল। তিনি বলেন, লোক না থাকায় আমাকে গুলি নিয়ে যেতে বলেন ওসি স্যার। নিরুপায় হয়ে এসি নাহিদ ফেরদৌসের কাছে ২০০ রাউন্ড শিসা গুলি পৌঁছে দেই আমি।

১৯ জুলাইও বেতার অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন নাহিদ। ওই দিন যাত্রাবাড়ী মাছ বাজারের কাছে আউটগোয়িং ফ্লাইওভারে দায়িত্বরত পার্টি কমান্ডার ব্রাভো ট্যাংগো-২৮২ (এসি ট্রাফিক ডেমরা) ওয়্যারলেসে চায়না রাইফেলের গুলি চান। ইনকামিং ফ্লাইওভারে দায়িত্বরত পার্টি কমান্ডার যাত্রাবাড়ী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জাকিরও একই ধরনের গুলি চান।

কনস্টেবল নাহিদ বলেন, এসব কথা তাৎক্ষণিক ওসি আবুল হাসানকে জানানো হয়। এবারও আমাকে গুলি নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। বারবার নিষেধ করা সত্ত্বেও আমাকেই অস্ত্রাগার থেকে গুলি সরবরাহ করতে বলেন তিনি। গুলি নিয়ে যেতে দেরি হলে ওয়্যারলেসে পার্টি কমান্ডাররা অশোভন কথাবার্তা বলতে থাকেন। এরপর ওসি স্যারের নির্দেশে নিরুপায় হয়ে অস্ত্রাগার থেকে ৪০০ রাউন্ড চায়না রাইফেলের গুলি নিয়ে যাই। এর মধ্যে ৩০০ রাউন্ড পার্টি কমান্ডার ব্রাভো ট্যাংগো-২৮২ ও ১০০ রাউন্ড দেওয়া হয় জাকির স্যারকে।

জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়, ২০ জুলাই তিনি কানাঘুষায় জানতে পারেন যে, যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় একজনকে মেরে ফেলেছেন পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির। ৮-১০ দিন পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ইউটিউবে জাকিরের গুলি করার সেই দৃশ্যও দেখতে পান তিনি। যাকে গুলি করা হয়েছে, তার নাম তাইম ভূঁইয়া।

এদিন গুলি করার ২ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও প্রদর্শন করা হয় ট্রাইব্যুনালে। ভিডিওতে যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেনকে শনাক্ত করেন কনস্টেবল নাহিদ। খুব কাছ থেকেই তাকে গুলি করতে দেখা যায়। জবানবন্দি শেষে নাহিদকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ১০ মে দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।

প্রসিকিউশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন, মঈনুল করিম ও আবদুস সোবহান তরফদার।

এ মামলায় ১১ আসামির মধ্যে দুজন গ্রেপ্তার রয়েছেন। তারা হলেন- যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ওসি আবুল হাসান ও সাবেক এসআই শাহাদাত আলী। পলাতক আসামিরা হলেন- ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান, যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারি জোনের সাবেক ডিসি ইকবাল হোসাইন, এডিসি শাকিল মোহাম্মদ শামীম, ডেমরা জোনের তৎকালীন এডিসি মো. মাসুদুর রহমান মনির, তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন, পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) ওহিদুল হক মামুন ও এসআই (নিরস্ত্র) সাজ্জাদ উজ জামান।

আরও পড়ুন