উপার্জনের শেষ অবলম্বন চুরি, দিশেহারা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী পরিবার

উপার্জনের শেষ অবলম্বন চুরি, দিশেহারা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী পরিবার

মেহেরপুরের গাংনীতে এক অসহায় পরিবারের জীবনে নেমে এসেছে চরম সংকট। পরিবারের চার সদস্যের মধ্যে তিনজনই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির পাখিভ্যানটি চুরি হয়ে যাওয়ায় এখন অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে পরিবারটির।

ঘটনাটি গাংনী উপজেলার কাথুলী ইউনিয়নের রাধাগোবিন্দপুর ধলা গ্রামের। ভ্যানচালক আব্দুল লতিব (৫৫) ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। তার দুই ছেলে ও স্ত্রী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। সম্প্রতি ঋণ নিয়ে কেনা ব্যাটারিচালিত পাখিভ্যানটিই ছিল সংসারের একমাত্র আয়ের উৎস। কিন্তু গত ২৮ এপ্রিল দিবাগত রাতে বাড়ি থেকে ভ্যানটি চুরি হয়ে যায়।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভ্যানটি হারানোর পর থেকেই পরিবারটি অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। একদিকে এনজিওর কিস্তির চাপ, অন্যদিকে সংসারের খাদ্য সংকট, সব মিলিয়ে দিশেহারা অবস্থায় পড়েছেন আব্দুল লতিব।

জানা যায়, কয়েক মাস আগে একটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে তিনি ব্যাটারিচালিত ভ্যানটি কিনেছিলেন। সেই ঋণের কিস্তি এখনও পরিশোধ হয়নি। এমন অবস্থায় আয়ের একমাত্র মাধ্যম হারিয়ে পরিবারটি যেন দাঁড়িয়ে আছে অথৈ সাগরের কিনারায়।

ভ্যানচালক আব্দুল লতিব বলেন, ‘আমাদের ঘরটা ভাঙাচোরা, কোনোরকমে পরিবার নিয়ে থাকি। পরিবারের সবাই কোনো না কোনোভাবে প্রতিবন্ধী হওয়ায় সব দায়িত্ব আমার উপর। অনেক কষ্ট করে ঋণ নিয়ে ভ্যানটা কিনেছিলাম, সেটাই ছিল একমাত্র ভরসা। কিন্তু সেটাও চুরি হয়ে গেল। এখন একবেলা খেয়ে না খেয়ে থাকতে হচ্ছে। কিস্তির চাপ বাড়ছে, অবস্থায় কীভাবে সংসার চালাবো, তা ভেবে পাচ্ছি না।’

প্রতিবেশী হাসান আলী বলেন, ‘আব্দুল লতিব দীর্ঘদিন ধরে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। মাঠের মধ্যে একটি ঝুপড়ি ঘরে কোনো রকমে দিন কাটছে তাদের। বৃষ্টি হলে ঘরের ভেতরে পানি ঢুকে পড়ে, আর সামান্য ঝড় উঠলেই আতঙ্কে থাকতে হয় কখন ভেঙে পড়ে ঘরটি। তার ওপর পোকা-মাকড়ের ভয়ও রয়েছে সবসময়। এমন দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যেই তাদের একমাত্র উপার্জনের মাধ্যম পাখিভ্যানটি চুরি হয়ে যাওয়ায় পরিবারটি এখন সম্পূর্ণ দিশেহারা হয়ে পড়েছে।’

আরেক প্রতিবেশী আরোজ আলী বলেন, ‘আব্দুল লতিবের পরিবারটি এলাকায় অত্যন্ত অসহায় হিসেবে পরিচিত। ভ্যান চালিয়েই কোনোভাবে তাদের সংসার চলত। কিন্তু ভ্যানটি চুরি হওয়ার পর থেকে তাদের অবস্থা আরও করুণ হয়ে উঠেছে। এখন নিয়মিত খাবার জোটানোই কঠিন হয়ে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘এই পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো এখন সমাজের দায়িত্ব।’

স্থানীয় ইউপি সদস্য ফারুক হোসেন বলেন, ‘আব্দুল লতিব দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর ধরে প্যাডেলচালিত ভ্যান চালিয়ে কোনোভাবে সংসার চালিয়ে আসছিলেন। বয়স ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে তিনি কয়েক মাস আগে ঋণ নিয়ে একটি ব্যাটারিচালিত পাখিভ্যান কেনেন, যাতে পরিবার নিয়ে একটু ভালো থাকা যায়। কিন্তু রাতের আঁধারে চোরেরা ভ্যানটি চুরি করে নিয়ে যাওয়ায় তিনি এখন সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভ্যানটিই ছিল পরিবারটির তিনবেলা খাবারের একমাত্র ভরসা। এখন সেটি না থাকায় তারা চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছে।’ তিনি ব্যক্তিগতভাবে পরিবারটিকে কিছু সহযোগিতা করার পাশাপাশি প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

গাংনী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি তদন্ত) আল মামুন জানান, চুরি যাওয়া ভ্যানটি উদ্ধারে পুলিশ কাজ করছে এবং বিভিন্ন সূত্রে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে।

গাংনী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘ভ্যানটি চুরি হওয়ায় পরিবারটি চরম কষ্টে আছে। বিষয়টি দুঃখজনক। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।’

এ অবস্থায় মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে সমাজের বিত্তবান ও সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

আরও পড়ুন