কক্সবাজারের রামু উপজেলার আইনজীবী ও ব্যবসায়ী মো. আলাউদ্দিন রবিন (৪০) বিট-খাটাল কেলেঙ্কারির শিকার হয়েছেন। ‘মেসার্স জিতু এন্টারপ্রাইজ’-এর মাধ্যমে গবাদি পশু ব্যবসায়ী তিনি মিয়ানমার থেকে গরু আমদানির অনুমোদন পেতে গিয়ে ভুয়া কাগজপত্রের ফাঁদে পড়েন। প্রতারক চক্র সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার স্বাক্ষর জাল করে দুই লাখ গরু আমদানির অনুমোদনপত্র তৈরি করে, যার বিনিময়ে গরুপ্রতি দুই হাজার টাকা করে মোট ৪০ কোটি টাকা দাবি করা হয়। তবে ভুক্তভোগীর সতর্কতায় এই প্রতারণা ভেস্তে যায়।
মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আলাউদ্দিন রবিনের সঙ্গে পূর্বপরিচিত খোরশেদ আলমের কথা হয়। খোরশেদ আলম একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের মহাপরিচালক ও যুগ্ম সচিব মফিদুল আলমের ভাই। তিনি সরকারি উচ্চপর্যায়ে সংযোগের কথা বলে গরু আমদানির অনুমোদন এনে দেওয়ার আশ্বাস দেন। পরে আলাউদ্দিনকে আব্দুল্লাহ জাবেদ নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয়। ২ মার্চ জাবেদ ও খোরশেদ আলম তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য একটি আবেদনপত্রের নমুনা দেন। সেই নমুনার ভিত্তিতে আলাউদ্দিন আবেদন তৈরি করে হোয়াটসঅ্যাপে খোরশেদ আলমকে পাঠান।
১৯ মার্চ আলাউদ্দিন ঢাকার মিরপুর ডিওএইচএস এলাকায় জাফর ইকবাল ওরফে রাঙ্গার অফিসে যান। জাফর ইকবাল দাবি করেন, তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে গরু আমদানির অনুমোদন এনে দিতে পারবেন। তিনি দুই লাখ গরু আমদানির বিপরীতে গরুপ্রতি দুই হাজার টাকা করে মোট ৪০ কোটি টাকা নির্ধারণ করেন, যার মধ্যে ২০ কোটি টাকা জাফর ইকবালের অংশ এবং ১০ কোটি টাকা অগ্রিম দেওয়ার শর্ত রাখা হয়। আলাউদ্দিন সন্দেহবশত সরাসরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে আবেদনের সত্যতা যাচাই করেন। সেখানে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পিএস জানান, তার নামে কোনো আবেদন জমা হয়নি এবং প্রদর্শিত মঞ্জুরিপত্রটি সম্পূর্ণ ভুয়া। পরে রাজধানীর পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করে ডিবি পুলিশ।
সিআইডির তদন্তে পাঁচজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। আসামিরা হলেন— জাফর ইকবাল ওরফে রাঙ্গা, মো. আব্দুল্লাহ জাবেদ, খোরশেদ আলম, শাহাবুদ্দীন আহমদ ও মো. হযরত আলী। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য আবেদনপত্রের নমুনা প্রথমে শাহাবুদ্দীন আহমদের নম্বর থেকে জাফর ইকবালকে পাঠানো হয়। শাহাবুদ্দীন আহমদ সাময়িক বরখাস্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। তিনি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার ভুয়া সুপারিশসহ স্বাক্ষর সরবরাহ করেন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের এক উপসচিবের সিল ও স্বাক্ষরসহ একটি ভুয়া আদেশনামাও পাঠানো হয়। এছাড়া শাহাবুদ্দীন ও জাফর ইকবালের হোয়াটসঅ্যাপের কথোপকথনে সরকারি বিভিন্ন কর্মকর্তার বদলির সুপারিশও পাওয়া যায়।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শাহাবুদ্দীন নিজের পরিচয় গোপন রাখতে হযরত আলী নামে এক ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করতেন, যার নামে দেশের বিভিন্ন থানায় একাধিক প্রতারণার মামলা রয়েছে। জাফর ইকবাল ‘প্রামানিক ট্রেডিং কর্পোরেশন’ নামে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আড়ালে ডিওএইচএস এলাকায় অফিস ভাড়া নিয়ে প্রতারণামূলক কাজ পরিচালনা করতেন। ভুক্তভোগী আলাউদ্দিন রবিন জানান, চুক্তি অনুসারে তারা ১০ কোটি টাকা অগ্রিম চেয়েছিল, কিন্তু তিনি কোনো টাকা পরিশোধ করেননি। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক আবুল কালাম জানান, চারজন আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
