বেঁচে থাকলে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতাম—বন্ধুহারা ফোরকানের আহাজারি

বেঁচে থাকলে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতাম—বন্ধুহারা ফোরকানের আহাজারি

ওমানের মুলাদ্দাহ এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের চার ভাইয়ের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় শোকে স্তব্ধ চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া। স্বজনদের আহাজারির পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বইছে শোকের মাতম। নিহত চার ভাইয়ের মধ্যে মোহাম্মদ শহীদের বন্ধু ফোরকানের আবেগঘন একটি ফেসবুক পোস্ট হৃদয় ছুঁয়ে গেছে সবার।

ফোরকান নিজের ফেসবুক পোস্টে আবেগঘন স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, ‘আমি পারছি না আর বন্ধু, নিজেকে সামলাতে… তোর সঙ্গে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। আজ তুই বেঁচে থাকলে হয়তো তোকে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতাম। আফসোস, সেই সময়টা আর কখনো আসবে না।’

তিনি আরও লেখেন, ‘আমাদের মেসেজগুলো তোর আইডিতে হাজার বছর ধরে রয়ে যাবে। ২০২১ ব্যাচের বন্ধুদের স্মৃতিগুলোও থাকবে। তোকে ‘সাদ্দাম’ বলে আর ডাকা হবে না। আজ তোর চেয়ে তোর মায়ের জন্য বেশি কষ্ট হয়। হতভাগা মা তোদের সুখ আর দেখল না। ভালো থাকিস ওপারে বন্ধু, আল্লাহ তোকে জান্নাতুল ফেরদৌসের উচ্চ মাকাম দান করুন।’

গত মঙ্গলবার রাতে ওমানের মুলাদ্দাহ এলাকায় একই পরিবারের চার ভাইয়ের একসঙ্গে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন– চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বন্দাররাজা পাড়ার প্রয়াত মোহাম্মদ হাসানের ছেলে রাশেদুল ইসলাম, সাহেদুল ইসলাম, মো. সিরাজ ও মো. শহীদ। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে একজন দেশে থাকলেও বাকি চার ভাই প্রবাসে ছিলেন।

ওমানে অবস্থানরত প্রবাসীদের ভাষ্য, বুধবার সন্ধ্যায় চার ভাই ওমানের বারকা এলাকা থেকে মুলাদ্দাহর উদ্দেশে রওনা হন। রাত ৮টার পর তাদের একজন এক আত্মীয়কে ভয়েস মেসেজে অসুস্থতার কথা জানান। একই সঙ্গে নিজেদের অবস্থান পাঠিয়ে বলেন, গাড়ি থেকে বের হওয়ার মতো অবস্থায় তারা নেই। পরে মুলাদ্দাহ এলাকার একটি ক্লিনিকের সামনে পার্কিং করা গাড়ির ভেতরে চারজনকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে গাড়ির দরজা খুলে তাদের মরদেহ উদ্ধার করে।

ওমান পুলিশের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়, দীর্ঘ সময় গাড়িটি চালু অবস্থায় স্থির থাকার কারণে এসি থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাস গাড়ির ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে। সেই গ্যাস শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করায় তাদের মৃত্যু হয়েছে।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস সূত্রে জানা গেছে, নিহত চার ভাইয়ের মধ্যে শহীদ ও সিরাজের ১৫ মে দেশে আসার কথা ছিল। মাস্কাট থেকে চট্টগ্রামগামী ফ্লাইটের টিকিটও নিশ্চিত করা হয়েছিল। এ ছাড়া আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর পুনরায় ওমানে ফেরার টিকিটও কাটা ছিল তাদের।

ওমানে বাংলাদেশ দূতাবাসের লেবার কাউন্সিলর রাফিউল ইসলাম জানান, চার ভাইয়ের মরদেহ স্থানীয় পুলিশের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে। স্পন্সরের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কাজ শেষ হলে আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।

শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে নিহতদের পরিবারের খোঁজখবর নিতে তাদের বাড়িতে যান রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘এই পরিবারের সদস্যরা আপনাদেরই আপনজন। যারা ইন্তেকাল করেছেন, তাদের জন্য সবাই দোয়া করবেন। একই সঙ্গে সমাজের দায়িত্ব হচ্ছে এই কঠিন সময়ে পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো।’

তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে আরও বলেন, ‘আমরা সবাই দুনিয়া নিয়ে এত ব্যস্ত থাকি যে পরকালের কথা ভুলে যাই। অথচ মৃত্যু যেকোনো সময় চলে আসতে পারে। এই ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, পৃথিবীতে আমরা কেউ চিরস্থায়ী নই।’ তিনি বলেন, ‘নিহতদের পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে এখন একজন জীবিত আছেন। স্বজন হারানোর বেদনা তিনিই সবচেয়ে বেশি অনুভব করছেন। তাই তার পাশে দাঁড়ানো সবার দায়িত্ব।’

মরদেহ দেশে আনার বিষয়ে এমপি হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, ‘আশা করছি আগামী মঙ্গলবারের মধ্যেই মরদেহ দেশে পৌঁছাবে। এ বিষয়ে ওমানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সহযোগিতা করছে। বাংলাদেশ সরকারও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছে।’

অন্যদিকে, গত বৃহস্পতিবার নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা তাদের বাড়িতে যান। একই দিন নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতের আয়োজন করে উপজেলা জামায়াতে ইসলামী। উপজেলা জামায়াত কার্যালয়ে আয়োজিত দোয়া মাহফিলে বক্তারা নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। পরে নিহতদের রুহের মাগফিরাত কামনা এবং পরিবারের সদস্যদের ধৈর্য ধারণের তৌফিক কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।

আরও পড়ুন