শেরপুরে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা হারানোর শঙ্কা

শেরপুরে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা হারানোর শঙ্কা

শেরপুরের নালিতাবাড়ীর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী পল্লীর বাসিন্দা জীবন কৃষ্ণ হাজং। ছোটবেলায় মায়ের কাছ থেকে শিখেছিলেন হাজং ভাষার লোকগান, লোককথা। সেই ভাষাই ছিল তার শৈশবের অবিচ্ছেদ্য অংশ; কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় তার দুই সন্তান সেই ভাষা বোঝে না। বাড়িতে হাজং ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করলেও সন্তানরা জবাব দেয় বাংলায়। জীবন কৃষ্ণের আক্ষেপ- আমি যদি আমার সন্তানদের সঙ্গেই নিজের ভাষায় কথা বলতে না পারি, তাহলে আমার ভাষার ভবিষ্যৎ কী?

শুধু জীবন কৃষ্ণ হাজং নন, শেরপুরের প্রায় ২০ হাজার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ একই বাস্তবতার মুখোমুখি। গারো, হাজং, কোচ, বর্মণ, বানাই, ডালু ও হদি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায় এখানে বসবাস করলেও তাদের মাতৃভাষার পাঠ্যবই নেই, নেই প্রশিক্ষিত শিক্ষকও। তাদের নিজস্ব ভাষার বর্ণমালাও হারানোর পথে। ফলে শিক্ষার্থীদের বাংলা ভাষার ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। হারিয়ে যেতে বসেছে তাদের নিজস্ব ভাষার সংস্কৃতি।

শেরপুর জেলায় এমন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ শত বছর ধরে বসবাস করছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগই ভারতের মেঘালয় সীমান্তবর্তী শেরপুর জেলার তিনটি উপজেলার গারো পাহাড় এলাকায় বসবাস করে। বাকিরা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সমতলে বসবাস করে।

শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার কল্পনা রানী হাজং জানান, এক সময় তিনি মাতৃভাষায় কথা বলতেন, কিন্তু সন্তানদের শুধু বাংলা শেখাচ্ছেন। কারণ মাতৃভাষায় কথা বলার কারণে বিভিন্ন জায়গায় তাকে লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে। সরকারি অফিস, ব্যাংক কিংবা বাজারে গেলেও ভাষাগত কারণে তাকে অপমান সহ্য করতে হয়েছে।

ঝিনাইগাতী উপজেলার রাংটিয়া এলাকার সন্ধ্যা কোচ নামে দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, স্কুলে শুধু বাংলা পড়ি। মাতৃভাষায় কিছু নেই। ফলে আমরা আমাদের ভাষা ভুলে যাচ্ছি। স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ক্লোডিয়া নকরেক কেয়া বলেন, আগে আমরা আমাদের ভাষায় কথা বলতাম, কিন্তু এখন বাংলা ছাড়া কিছুই নেই। স্কুল-কলেজে আমাদের ভাষার কোনো চর্চাই হয় না। শুনেছি স্কুলে আমাদের ভাষার বই দেওয়া হয়েছে, কিন্তু শিক্ষক নেই।

গারো সম্প্রদায়ের শিউলি মারাক বলেন, আমাদের ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা আমাদের ভাষায় কথা বলতে চাই, কিন্তু সমাজ আমাদের সেই সুযোগ দেয় না। বর্মণ সম্প্রদায়ের সুকেশ বর্মণ বলেন, আমরা বর্মণ ভাষায় কথা বলতে পারি না, বাংলা ভাষায় কথা বলি। আমাদের ভাষার বই যদি সরকার চালু করত, তাহলে আমাদের ভাষাটা টিকে থাকত।

সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, শেরপুরে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনসংখ্যা প্রায় ২০ হাজার ৮৪০। এর মধ্যে গারো, কোচ, বর্মণ, হাজং, ডালু, হুদি, মসুর, মার্মা, ম্রো, চাক, মাহালীসহ ১৬টির বেশি সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছে। জনসংখ্যার দিক দিয়ে গারোরা সবচেয়ে বেশি, এরপর রয়েছে বর্মণ, কোচ, হাজং ও হুদি সম্প্রদায়।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, অন্যান্য যে নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছে তার সংখ্যা ১ থেকে ১০ জনের মধ্যে। এরা বৈবাহিক সূত্রে এবং চাকরি সুবাদে শেরপুরে এসে বসতি স্থাপন করেছে বলে স্থানীয় নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের নেতারা জানিয়েছেন। তবে শেরপুরে আদি নিবাস হিসেবে ওই সাতটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করে আসছে।

শেরপুরের বিভিন্ন উপজেলায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের সংখ্যা বিভিন্নরকম। নালিতাবাড়ী উপজেলায় তাদের সংখ্যা ৮ হাজার ১১১ জন, ঝিনাইগাতী উপজেলায় ৬ হাজার ৯৩৮ জন, শ্রীবরদী উপজেলায় ৩ হাজার ৪৭৬ জন, সদর উপজেলায় ১ হাজার ৫৩১ জন এবং নকলা উপজেলায় মাত্র ৭৮৪ জন। এ সম্প্রদায়ের মধ্যে ৭৩.২৭ শতাংশ পরিবার পুরুষপ্রধান এবং ২৬.৭৩ শতাংশ পরিবার নারীপ্রধান।

বিবিএসের আরেকটি গবেষণা বলছে, শেরপুরের ৩৫ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থী এখনো স্কুলের বাইরে। উচ্চশিক্ষিত মাত্র ৩ শতাংশ। ফলে অনেকেই ভাষার সঙ্গে নিজেদের শিকড় হারিয়ে ফেলছে। শিক্ষকরাও মনে করেন, মাতৃভাষায় শিক্ষা নিশ্চিত না হলে এই জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা করা সম্ভব নয়।

স্থানীয় এক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সুব্রত রেমা বলেন, আমরা চেষ্টা করি মাতৃভাষার কিছু উপাদান ক্লাশে আনতে; কিন্তু পাঠ্যপুস্তক নেই, ফলে তা সম্ভব হয় না। যদি সরকার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের নিজস্ব ভাষায় বই তৈরি করত, তাহলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের ভাষা রক্ষা করতে পারত। আইইডির আদিবাসী সক্ষমতা উন্নয়ন প্রকল্পের ফেলো সুমন্ত বর্মণ বলেন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি শুধু তাদের নিজস্ব সম্পদ নয়, এটি দেশের ঐতিহ্যের অংশ। এই ভাষাগুলো হারিয়ে গেলে আমরা আমাদের সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হারিয়ে ফেলব।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাইদুল ইসলাম জানান, চলতি বছর গারো ভাষার কিছু বই এসেছে, তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা অনেক কম। এছাড়া প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাবও রয়েছে, যার কারণে এ মুহূর্তে মাতৃভাষায় পাঠদান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তবে ১০-১২ জন শিক্ষক রয়েছে তাদের মধ্যে একজনকে মাস্টার ট্রেইনারের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিয়ে শিক্ষক সংকট কাটানো হবে।

জেলা প্রশাসক তরফদার মাহমুদুর রহমান জানান, শেরপুরের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের মানুষের সবাই যেন তাদের মাতৃভাষায় কথা বলতে পারে এবং শিশুরা পড়াশোনা করতে পারে সেই বিষয়ে ইতোমধ্যে কয়েকটি ভাষায় বই রচনা করা হয়েছে। এগুলো খুব দ্রুত তাদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। তবে শিক্ষক স্বল্পতার একটা সমস্যা রয়েছে। তাদের ভাষার শিক্ষক নিয়োগের বিষয়েও চিন্তা-ভাবনা চলছে। এছাড়াও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ও সংস্কৃতি রক্ষায় কালচারাল একাডেমি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের জন্য কাজ করছি।

আরও পড়ুন