মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘাত দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক হামলার পর উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা লেবাননসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
হামলার প্রথম ধাপে তেহরানসহ বিভিন্ন এলাকায় ইরানের সামরিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং নিরাপত্তা অবকাঠামো লক্ষ্য করে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। ইসরায়েলি বাহিনীর দাবি, এসব হামলায় ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। এ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। পরে তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করা হয়।
হামলার জবাবে ইরান ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। কাতার, বাহরাইন, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েতে বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ও ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এসব হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলে অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত জানান, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানে ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্তত ১ হাজার ২০৫ জন বেসামরিক নাগরিক।
সংঘাত দ্রুত লেবাননেও ছড়িয়ে পড়ে। ২ মার্চ ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে রকেট নিক্ষেপ করলে ইসরায়েল পাল্টা বিমান হামলা চালায়। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী বৈরুতসহ বিভিন্ন এলাকায় চালানো হামলায় ৮৩ শিশুসহ ৩৯০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এই সংঘাতে এক লাখের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে, যা তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলাকে ‘প্রতিরোধমূলক সামরিক পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তবে ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা কম। ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রয়েছে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী এবং ইরাক ও সিরিয়ার বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী। এদের অনেকেই ইতোমধ্যে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। এই কারণে আশঙ্কা করা হচ্ছে, সংঘাত আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব ফেলছে। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) স্থাপনা এবং সৌদি আরবের একটি বড় তেল শোধনাগারও হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই যুদ্ধ কোভিড-১৯ মহামারির পর বৈশ্বিক ভ্রমণে অন্যতম বড় বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আকাশসীমা বন্ধ হয়ে গেছে এবং হাজারো ফ্লাইট স্থগিত হয়েছে। ইতিহাদ এয়ারলাইনস এবং এমিরেটস এয়ারলাইনস কিছু সীমিত ফ্লাইট পুনরায় চালু করেছে।
সংঘাত কতদিন স্থায়ী হতে পারে, তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট ধারণা নেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমদিকে বলেছিলেন, সামরিক অভিযান চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। পরে হোয়াইট হাউস জানায়, পরিস্থিতি অনুযায়ী অভিযান ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হতে পারে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই সামরিক অভিযান চলবে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে অঞ্চলজুড়ে বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, বিশেষ করে লেবানন, সিরিয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে শরণার্থী সংকট দেখা দিতে পারে।
