যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের বাজারে ভয়াবহ অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রতিটি দেশে পেট্রল ও ডিজেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো সংকটের মুখে পড়েছে।
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে গত ফেব্রুয়ারিতে নিয়মিত এক গ্যালন পেট্রলের গড় দাম ছিল ২.৯৪ ডলার, যা বর্তমানে ২০ শতাংশ বেড়ে ৩.৫৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার মতো কিছু অঙ্গরাজ্যে দাম গ্যালন প্রতি ৫ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
গ্লোবাল পেট্রল প্রাইসেস-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যুদ্ধ শুরুর পর অন্তত ৮৫টি দেশে পেট্রলের দাম বেড়েছে। শতাংশের হিসেবে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে ভিয়েতনামে, যেখানে লিটার প্রতি দাম ৫০ শতাংশ বেড়ে ১.১৩ ডলারে পৌঁছেছে। লাওস (৩৩ শতাংশ), কম্বোডিয়া (১৯ শতাংশ), অস্ট্রেলিয়া (১৮ শতাংশ) এবং যুক্তরাষ্ট্র (১৭ শতাংশ) এর পরেই অবস্থান করছে।
এশিয়ার দেশগুলো তাদের প্রয়োজনীয় তেল ও গ্যাসের জন্য প্রধানত হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। এই পথটি বন্ধ থাকায় জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া চরম সংকটে পড়েছে। জাপান তাদের কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং দক্ষিণ কোরিয়া পেট্রল ও ডিজেলের ওপর সর্বোচ্চ মূল্যসীমা নির্ধারণ করেছে।
সঙ্কট আরও ঘনীভূত হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায়। আর্থিক সক্ষমতা কম থাকায় পাকিস্তান ও বাংলাদেশ বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। পাকিস্তানে সরকারি অফিসগুলোতে চার দিনের কর্মদিবস চালু করা হয়েছে এবং স্কুলগুলো বন্ধ করে ৫০ শতাংশ ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ নীতি কার্যকর করা হয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খাদ্যপণ্যের দামও বাড়ছে। অর্থনীতিবিদ ডেভিড ম্যাকউইলিয়ামস বলেছেন, পরিবহন হলো বিশ্ব অর্থনীতির জীবনশক্তি। সরবরাহ ব্যবস্থা ও লজিস্টিকস বিঘ্নিত হওয়ায় মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্ব বাড়ছে, ফলে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’-এর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা উল্লেখ করেছেন, ১৯৭৩, ১৯৭৮ এবং ২০০৮ সালে তেলের দাম বাড়ার পর বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছিল। জ্বালানি তেলের ব্যবহার গাড়ি চালানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; হাজার হাজার পণ্য খনিজ তেল থেকে তৈরি হয়।
এশিয়া ছাড়া ইউরোপেও অস্থিরতা শুরু হয়েছে। জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীরা জরুরি বৈঠক করেছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ গ্রাহকদের ওপর চাপ কমাতে জরুরি কৌশলগত মজুতের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ তেল বাজারে ছাড়ার প্রস্তাব দিয়েছেন।
হরমুজ প্রণালি, যা বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের ধমনি হিসেবে পরিচিত, দৈনিক প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পরিবাহিত হয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্যমতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত জ্বালানি তেলের প্রায় ৭০ শতাংশের ভোক্তা দক্ষিণ এশিয়া, যার মধ্যে চীন, জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও ফিলিপাইন অন্তর্ভুক্ত।
