বাঘ কি প্রতিশোধ নেয়? এই প্রশ্ন ঘিরে বিজ্ঞানী ও গবেষকদের মধ্যে রয়েছে নানা মত ও ভিন্নমত। বাঘের শক্তি, বুদ্ধিমত্তা ও হিংস্রতা নিয়ে প্রচলিত গল্প-কথার পেছনে কতটুকু সত্যি, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে অরণ্যের গভীরে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা চেনা সমীকরণকে হার মানায়।
১৯৯৭ সালে রাশিয়ায় শিকারি ভ্লাদিমির মারকভ একটি আমুর বাঘকে গুলি করে আহত করেন ও তার শিকার করা মাংস ছিনিয়ে নেন। বাঘটি পালিয়ে গেলেও পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা ধরে সে মারকভকে অনুসরণ করে, তার কেবিনে ঢুকে গায়ের গন্ধ লেগে থাকা সবকিছু তছনছ করে এবং দরজার বাইরে ওত পেতে থাকে। মারকভ বাড়ি ফেরার পর বাঘটি তাকে আক্রমণ ও হত্যা করে জঙ্গলে টেনে নেয়।
জন ভেইল্যান্ট তার বই ‘দ্য টাইগার: এ ট্রু স্টোরি অব ভেঞ্জেন্স অ্যান্ড সারভাইভাল’-এ এই ঘটনাকে ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে বিজ্ঞানীরা বাঘের এ ধরনের আচরণকে মানুষের মতো ‘প্রতিশোধ’ বলতে নারাজ। তাদের মতে, এটি বেঁচে থাকা, স্মৃতিশক্তি ও অস্তিত্বের হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়ার বহিঃপ্রকাশ।
বন্যপ্রাণী গবেষক সাই মন্টগোমারি তার ‘স্পেল অব টাইগার: দ্য ম্যান-ইটার্স অব সুন্দরবন’ বইয়ে সুন্দরবনের বাঘের আচরণ বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি লক্ষ করেছেন, সুন্দরবনের বাঘ পৃথিবীর সবচেয়ে ‘অদৃশ্য’ শিকারি। তারা মানুষকে ভয় পায় না, বরং খাদ্যশৃঙ্খলের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখে। স্থানীয়দের বিশ্বাসে বাঘ মানে ‘দক্ষিণ রায়’—বনের দেবতা।
মন্টগোমারির মতে, সুন্দরবনের নোনা পানি বাঘের যকৃতে প্রভাব ফেলে, ফলে তাদের মেজাজ খিটখিটে ও আক্রমণাত্মক হয়। জোয়ার-ভাটায় ইউরিন মার্কিং মুছে যাওয়ায় তারা এলাকা চিহ্নিত করতে পারে না। যদি কোনো বনজীবী বাঘকে আঘাত করে বা বাচ্চা চুরি করে, তবে সেই বাঘ নির্দিষ্ট এলাকাকে অনিরাপদ মনে করে এবং সেখানে আসা যেকোনো মানুষকে আক্রমণ করে। তবে বিশেষজ্ঞরা একে ‘প্রতিশোধ’ নয়, ‘প্রতিক্রিয়া’ বলেই মনে করেন।
বাংলাদেশের সাতক্ষীরার কিংবদন্তি বাঘ শিকারি পচাব্দী গাজী ৫৭টি বাঘ মেরেছিলেন। তার স্মৃতিচারণমূলক বই ‘সুন্দরবনের মানুষখেকো’ থেকে জানা যায়, তিনি বিশ্বাস করতেন বাঘ জন্মগতভাবে মানুষখেকো নয়; মানুষের সীমালঙ্ঘন ও বিরূপ প্রকৃতিই তাকে হিংস্র করে তোলে। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাঘ যখন বার্ধক্য বা আঘাতের কারণে বনের ক্ষিপ্র শিকার ধরতে ব্যর্থ হয়, তখনই সে লোকালয়ে হানা দেয়।
জিম করবেট (১৮৭৫–১৯৫৫) তার ‘ম্যান-ইটার্স অব কুমায়ুন’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, বাঘ সাধারণত মানুষকে ভয় পায় ও এড়িয়ে চলে। কিন্তু বৃদ্ধ, দাঁত ভাঙা বা শিকারির গুলিতে আহত বাঘ স্বাভাবিক শিকার ধরতে না পেরে সহজ শিকার হিসেবে মানুষকে বেছে নেয়। একবার মানুষের হাতে আহত হলে বাঘ মানুষের প্রতি বিদ্বেষী হয়ে ওঠে। করবেটের মতে, বাঘের তথাকথিত ‘প্রতিশোধ’ আসলে মানুষের আচরণেরই পাল্টা প্রতিক্রিয়া।
