বিরোধী দলকে ধৈর্য ধরে পারফরম্যান্স দেখার আহ্বান অর্থমন্ত্রীর

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২৫তম দিনে আর্থিক খাতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় নিয়োগের বয়সসীমা বিলুপ্ত সংক্রান্ত বিল পাসকে কেন্দ্র করে সংসদে উত্তপ্ত বিতর্ক হয়েছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর শীর্ষ পদের বয়সসীমা বিলোপের বিষয়টি নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি যুক্তি ও অভিযোগ ওঠে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিরোধী দলকে ধৈর্য ধরে পারফরম্যান্স দেখার আহ্বান জানান।

বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী অর্থমন্ত্রী ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন (সংশোধন) ২০২৬’ এবং ‘বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) বিল ২০২৬’ পাসের প্রস্তাব করেন। বিল দুটির ওপর আলোচনায় প্রথমেই আপত্তি তোলেন বিরোধী দল ও জোটের সদস্যরা।

বিলের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেন, অভিজ্ঞ ও যোগ্য ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় কাজে লাগাতেই বয়সসীমা শিথিল করা জরুরি। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ১৯৯৩ সালে সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন হওয়ার সময় মানুষের গড় আয়ু ছিল ৫৭ বছর, যা এখন বেড়ে ৭২ বছর হয়েছে। অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কেন এই কর্মযজ্ঞের বাইরে রাখা হবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও বলেন, বিশ্বের সফল অর্থনীতিগুলোতে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে যোগ্য ব্যক্তিদের বয়সের ফ্রেমে বাঁধা হয় না। দেশের আগামীর অর্থনীতির প্রয়োজনে প্রফেশনাল লোক দরকার এবং এখানে ইমোশনের কোনো সুযোগ নেই।

মন্ত্রীর বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেন বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, এর আগে ১৩৩টি অধ্যাদেশ বিল আকারে আসার সময়ও সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে বিরোধী দল পুরোপুরি কথা বলার সুযোগ পায়নি, এবারও একই প্রক্রিয়ায় অধিকার খণ্ডন করা হচ্ছে। সরকারের গত দুই মাসের কার্যকলাপের সমালোচনা করে তিনি বলেন, নীতিগত জায়গাগুলোতে যেভাবে পরিবর্তন আনা হচ্ছে তাতে জনগণের আকাঙ্ক্ষা শেষ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি অভিযোগ করেন, যেভাবে সাবেক গভর্নরকে বিদায় করা হয়েছে এবং নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তা গণতন্ত্র সমর্থন করে না। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, বয়সের বাধা তুলে দিয়ে সবকিছুকে পলিটিসাইজ বা রাজনৈতিকীকরণ করা হচ্ছে এবং গোষ্ঠী বা পরিবারকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

বিরোধী দলীয় নেতার অভিযোগের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সংসদীয় রুলস অব প্রসিডিউরের বাইরে গিয়েও বিরোধী দলের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হচ্ছে। অতীতে বিএনপি সরকারের সময়ও আর্থিক খাতে নিয়োগগুলো রাজনৈতিক বিবেচনায় হয়নি বলেই শৃঙ্খলা ছিল। তিনি বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দিয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নরের বিষয়ে তিনি বলেন, আপনি (বিরোধী দলীয় নেতা) বলছেন ‘প্রুফ অব দ্য পুডিং ইজ ইন দ্য ইটিং’। আসুন আমরা অপেক্ষা করি এবং দেখি। তিনি তার পারফরম্যান্সের মাধ্যমে যদি দলীয় কোনো বিষয় বা প্রভাবের প্রমাণ দেন, তখন আপনি তা বলতে পারবেন। আর এখন পর্যন্ত তার পারফরম্যান্স দেখছি। কোনো ব্যক্তি একটি দলের সমর্থক হতেই পারেন, কিন্তু তার যোগ্যতা থাকলে নিয়োগে অসুবিধা কোথায়? ‘প্রুফ অব দ্য পুডিং ইজ ইন দ্য ইটিং’ প্রবাদ উল্লেখ করে তিনি বিরোধী দলকে ধৈর্য ধরে পারফরম্যান্স দেখার আহ্বান জানান।

এদিকে আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই কি এই বয়সসীমা তুলে দেওয়া হয়েছে? সরকারি দল সংখ্যা গরিষ্ঠতার জোরে আইন পাস করছে ঠিকই, কিন্তু এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। ২০০১ সালে প্রধান বিচারপতির বয়স বাড়ানোর উদাহরণ টেনে তিনি সতর্ক করে বলেন, এভাবে বিশেষ কাউকে বসানোর জন্য আইন পরিবর্তন করা হলে শেয়ার বাজারের মতো স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানগুলো লুটপাটের অভয়ারণ্যে পরিণত হতে পারে। সরকার সৎ ও যোগ্য লোকের কথা বললেও জাতি এখন দেখার অপেক্ষায় আছে যে ভবিষ্যতে এসব পদে কাদের বসানো হয়। সব মিলিয়ে দুই বিল পাসকে কেন্দ্র করে সরকারি ও বিরোধী পক্ষের অনড় অবস্থানে সংসদ কক্ষ দীর্ঘ সময় সরগরম ছিল।

আরও পড়ুন