যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করবে কি সরকার?

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করবে কি সরকার?

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের করা বাণিজ্য চুক্তি ঘিরে বিতর্ক ও তা বাতিলের দাবি আবারও সামনে এসেছে। তবে বিএনপি সরকার চুক্তিটি বাতিল করবে না বলেই সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ধারণা দিচ্ছে। কিছু রাজনৈতিক দল ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনকারী চুক্তিটিকে ‘একপক্ষীয়’ ও ‘অসম’ বলে অভিযোগ করছে এবং তারা এটি বাতিলের দাবিতে কর্মসূচি নিয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের তিন দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিটি সই করে, তখনও এ নিয়ে সমালোচনা হয়। ‘অত্যন্ত গোপনীয়তার’ সাথে চুক্তিটি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ আছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চুক্তির বিষয়বস্তু প্রকাশের পরই কেবল বিষয়গুলো জানা গেছে। যদিও বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্টরা গোপনীয়তার অভিযোগ অস্বীকার করছেন।

এখন নির্বাচিত বিএনপির রাজনৈতিক সরকারের অবস্থান কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চুক্তি বিরোধীরা মনে করেন, সরকার চাইলে জাতীয় সংসদে আলোচনা-পর্যালোচনা করে চুক্তির ব্যাপারে অবস্থান নিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আলোচনা ও স্বাক্ষরের পুরো প্রক্রিয়ায় নেতৃত্বে ছিলেন ড. খলিলুর রহমান, যিনি ওই সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। তাকেই নির্বাচিত বিএনপি সরকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের পাশাপাশি রাজনীতিকদেরও কেউ কেউ বলছেন, খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করার পেছনে একটি বার্তা রয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান গত ৪ মার্চ সাংবাদিকদের বলেন, এই চুক্তিতে প্রধান দুই দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সম্মতি ছিল। তিনি বলেন, ‘ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ আমাদের প্রধান দুটি দলের প্রধানের সঙ্গে নির্বাচনের আগেই কথা বলেছেন এবং তারাও এতে সম্মতি দিয়েছিলেন।’ তবে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান তা অস্বীকার করে বলেন, ওই চুক্তি নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি।

বিএনপি সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে ধারণা পাওয়া যায় যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন সরকারের সম্পর্কের উন্নতি এবং ভূ-রাজনীতি বিবেচনায় নিয়েছেন এবং সেই বিবেচনা থেকে সরকার চুক্তিটি বাতিল করবে না। চুক্তি বাতিল বা পর্যালোচনার সুযোগ আছে বলে দাবি করছেন চুক্তিটির বিরোধী বিভিন্ন পক্ষ। বুধবার জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা পয়েন্ট অব অর্ডারে বলেন, চুক্তিতেই ষাট দিনের মধ্যে তা বাতিলের কথা বলা আছে। তিনি চুক্তি নিয়ে সংসদে আলোচনা ও তা বাতিলের দাবি জানান।

চুক্তি নিয়ে বিতর্কের মূল কারণ হলো, এটি গোপনীয়তার সাথে করা হয়েছে বলে অভিযোগ। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেই চুক্তির বিষয়বস্তু প্রকাশের পর তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে। চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জ্বালানি, ১৪টি বোয়িং বিমান কেনা থেকে শুরু করে গম, সয়াবিনসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য বাধ্যতামূলকভাবে আমদানি করতে হবে। এতে করে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তুলনামূলক কম দামে ও কম সময়ে পণ্য আমদানি থেকে বঞ্চিত হবে বাংলাদেশ। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সিনিয়র ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘বাজার অর্থনীতির নিয়ম-নীতি ভঙ্গ করে এই চুক্তি করা হয়েছে’।

চুক্তিটির ক্ষেত্রে পারস্পরিক বাণিজ্যের কথা বলা হলেও এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন। কারণ, চুক্তি অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্র যদি জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় সীমান্ত বা বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নেয়, তাহলে বাংলাদেশকেও তাদের সঙ্গে মিল রেখে ‘পরিপূরক বিধিনিষেধ’ গ্রহণ করতে হবে। আরও যে বিষয়টি আলোচনা বা বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে, তা হলো, চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তিতে যেতে পারবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। এখানে চীন-রাশিয়াকে লক্ষ্য করে এমন শর্ত আনা হয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা ধারণা করছেন।

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন চুক্তিটি স্বাক্ষরের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলছেন। তার বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্র যখন তাদের ন্যাশনাল ইমারজেন্সি ঘোষণা করে দেশে দেশে বাড়তি শুল্ক আরোপ করছে, তখন সেই শুল্ক কমিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের স্বার্থ দেখার বিষয় ছিল। তিনি উল্লেখ করেন, ৩৭ শতাংশ শুল্ক দিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য টিকিয়ে রাখা যেত না এবং রপ্তানি বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর সঙ্গে জড়িত প্রায় ১২ লাখ লোক চাকরি হারাতো।

সুত্রঃ বিবিসি

আরও পড়ুন